বন্ধনহীন গ্রন্থি

(অরুন্ধতী রয়ের ‘Mother Mary Comes to Me’ – একটি ব্যক্তিগত পাঠ)

‘In these pages, my mother, my gangster, shall live. She was my shelter, my storm.’ – লিখছেন অরুন্ধতী রয়, তাঁর ‘Mother Mary Comes to Me’ গ্রন্থে। অরুন্ধতী লিখবেন তাঁর মা মেরী রয়ের কথা, নিজের হয়ে-ওঠার কথা, আর আমরা পড়বো এক আশ্চর্য্য উপাখ্যান – কীভাবে সমস্ত হার-না-মানা স্বেদবিন্দু মিশে এক ক্ষীণ জলধারা হয়, কীভাবে সেই জলধারা যাপন-লাঞ্ছনার, বহুভাবে চেপে-বসা নির্মম সমাজের আয়তক্ষেত্র ভাঙতে ভাঙতে প্রবাহ হয়ে যায়।

সমগ্র গ্রন্থটি ৪২টি পরিচ্ছেদ দিয়ে তৈরি। তার প্রথমটির নাম ‘Gangster’, যেখানে মেরী রয়ের সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয়। এখান থেকেই ছোঁয়া যায় নামকরণের প্রছন্ন মুন্সীয়ানা, কৌতুক হয়তো বা। এ উপাখ্যান লেখা শুরু মেরী রয়ের মৃত্যুর পর, প্রথম লাইন, ‘She chose September, that excellent month, to make her move’। এই ‘মুভ’ আসলে শেষ মু্ভ; নিজের পীড়িত, ক্লান্ত শরীরকে ফেলে চলে যাওয়া। শেষ থেকে কাহিনীর শুরু। এরপর অরুন্ধতী ফিরে যাবেন উৎসের দিকে, মাদার মেরীর দিকে, যতখানি তিনি যাবেন, যেতে পারবেন, ততখানি তাঁর কাছে ফিরে আসবেন মাদার মেরী, মেরী রয়। অন্যদিকে, ‘মাদার মেরী’ বললেই যাঁর ছবি ফুটে ওঠে আমাদের ধর্মকল্প ক্যানভাসে, তাঁর সঙ্গে মেরী রয়ের মিল বিরোধাভাসে। আকন্ঠ-মদ্যপ স্বামীর সঙ্গে আসামে বিবাহিত জীবন ছেড়ে ইন্দোচীন যুদ্ধের সময় এক পুত্র (ললিথ কুমার ক্রিস্টোফার রয়) ও এক কন্যা (সুজানা অরুন্ধতী রয়)-কে নিয়ে কলকাতা চলে আসার পর তিনি আর কখনো স্বামীর কাছে ফিরে যাননি। এরপর উটি, তারপর কোট্টায়াম– পুরুষ-শাসিত সমাজে প্রায়-সম্বলহীন একা মায়ের তীব্র লড়াই, অনেক অপমান, লাঞ্ছনা পেরিয়ে জিতে যাওয়ার এক অমিত কাহিনী। একদিকে সেই মেরী রয় সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সর্বস্ব বাজী রেখে দাঁড়িয়ে পড়া এক নারী, অন্যদিকে নিজের পুঞ্জিত রাগ এবং অসহায়তা প্রকাশের জন্য সন্তানদের ওপর নিষ্ঠুর মাতৃত্বের চাবুক চালানো এক মা। এতটাই অবাক নির্মমতা ছিল সেই সন্তান-লালনের মধ্যে যে, মায়ের মৃত্যুতে বিপর্যস্ত অরুন্ধতীকে তাঁর দাদা ললিথ বলছেন, ‘I don’t understand your reaction. She treated nobody as badly as she treated you’। আর অরুন্ধতী বলছেন, ‘He could be right, although according to me, it was he who held that trophy. I can understand him feeling that I was humiliating myself by not acknowledging what had happened to us as children. But I had put that behind me a long time ago’।
মেরী রয় জেদ, অহংকার, লড়াই, জয়, দাপট, দয়া-মায়া-কারুণ্য-নির্মমতার সহাবস্থানে তৈরি এক জটিল কুহেলিকা। অরুন্ধতী সে কুহেলিকার পর্দা সরাতে সরাতে যতদূর অবদি তার সহজ জটিলকে খুঁজে নেবেন, ততদূর অবদি তিনি ফিরে পাবেন ‘মাদার মেরী’-কে।
অরুন্ধতীর কথায় (আপনাদের সঙ্গে আমার যে পাঠ অভিজ্ঞতা ভাগ করছি, তার অনেকখানি, অধিকাংশটাই, ভরা থাকবে অরুন্ধতীর নিজের কথায়),
I have seen and written about such sorrow, such systemic deprivation, and such unmitigated wickedness, such diverse iterations of hell, that I can only count myself among the most fortunate. I have thought of my own life as a footnote to the things that really matter. Never tragic, often hilarious. Or perhaps this is the lie I tell myself. Maybe I pitched my tent where the wind blows strongest hoping it would blow my heart clean out of my body. Perhaps what I am about to write is a betrayal of my younger self by the person I have become. If so, it’s no small sin. But I am not in a position to judge that।
আমার পাঠে ‘Mother Mary Comes to me’ এক দীর্ণ পরিক্রমা, উৎস থেকে মোহনা অবদি যার অন্বেষণ, অবলোকন থেকে উপলব্ধি অবদি যার মর্মরতা।

অরুন্ধতীর এই হয়ে-ওঠাকে মোটামুটি দুই পর্বে ভাগ করে দেখা যেতে পারে – বুকার পাওয়ার আগের জীবন, আর বুকার-পরবর্তী জীবন। আমরা প্রথম পর্বকেই একটু বেশিক্ষণ দেখবো, কারণ আমার পাঠে, ঐ অংশের ভাঙচুর পেরিয়ে, প্রতি মুহূর্তে ভেঙে যেতে যেতে পুনর্বার, বারংবার, নিজেকে গড়ে তুলতে তুলতে যে অরুন্ধতীর জন্ম, পরবর্তী অংশ তার উত্তরাধিকার হয়তো-বা। ঐ প্রথম অংশকেও আবার দুটি আলাদা অধ্যায়ে ভাগ করে পড়া যায় – প্রথম অধ্যায়, যতক্ষণ সুজানা অরুন্ধতী মেরী রয়ের আক্ষরিক অর্থে ‘আশ্রয়ে’ আছেন, আর দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু যখন ১৬-পেরোনো অরুন্ধতী দিল্লি চলে যাচ্ছেন স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়বেন বলে, ‘মিসেস রয়’-এর থেকে দূরে চলে গিয়ে বাঁচবেন বলে, নিজেকে হারিয়ে ফেলে আবার খুঁজবেন বলে। বলা থাক, দিল্লীতে ইপ্সিত স্কুলে ভর্তি হবার পর নামের ‘সুজানা’ অংশটি ত্যাগ করেছিলেন।

কোলকাতা থেকে মেরী রয় উটি এলেন তাঁর দুই অতি-অল্পবয়সী সন্তানকে নিয়ে তাঁর বাবার পরিত্যক্ত ভগ্ন কুটিরে কোনমতে মাথা গুঁজে দিতে। কিছুদিনের মধ্যে সুদূর কেরালার আয়মেমনেন থেকে হাজির হলেন তাঁর ভাই, তাঁদের উৎখাত করবেন বলে। শুরু হলো একা মায়ের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে টিঁকে থাকার লড়াই। ছিনিয়ে না নিলে সে অধিকার নিজের হয় না, কারণ শুধু মনুবাদ নয়, যে কোনো ধর্মাদেশ আসলে কায়েমী অধিকার টিকিয়ে রাখার পরিখা- ওপারে ওরা, এপারে, স্বর্গের আগের স্টেশনে, পুরুষ-সিংহ বাহিনীর ধর্মাবতার কলোনি। ভাই G. Isac-এর হাতিয়ার ছিল Travancore Christian Succession Act, যার নিদান ছিল, স্বাভাবিকভাবেই, পিতার সম্পত্তিতে কন্যার কোনো অধিকার নেই। স্বীকৃত অধিকারের জোর আর বিপন্নতার সংঘাতে জোর জিতে যায় বারংবার; কিন্তু এখানে প্রতিপক্ষ তো মেরী রয়। তাই হেরে গেলেন আইসাক; দেখা গেলো ওই আইন শুধু কেরালায় প্রযোজ্য। পরবর্তী সময়ে এক দীর্ঘ আইনি লড়াই-এর পর মেরী এই উত্তরাধিকার আইন বাতিল করে পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অধিকার, সমস্ত নারীর আপন অধিকার, আদায় করতে পেরেছিলেন।

তা এহেন মেরী রয় যখন স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন, অনেক দগ্ধ মুহূর্ত পেরিয়ে সে প্রয়াস সফল তো হবেই! জন্মের মালিন্য পেরিয়ে সে স্কুল ক্রমশ এক নিকেতন হয়ে উঠবে, সমস্ত শিশুদের মা হয়ে উঠবেন মেরী রয়; দিবারাত্র তাদের সমস্ত সুখ-অসুখের নিরাময়, তাদের প্রতিটি নৌকোযাত্রার কাণ্ডারী হয়ে উঠবেন, আলোমুখ মাদার মেরী হয়ে উঠবেন তাদের। আর তাঁর অন্ধকার সইবার, বইবার ভার কাঁধে নিয়ে এক ঝোড়ো শৈশব খাবি খেতে খেতে পেরোতে থাকবে তাঁর দুই আপন সন্তান। অরুন্ধতী বলছেন,
It was almost as though for her to shine her light on her students and give them all she had, we – he and I – had to absorb her darkness।

এই অন্ধকারে ভিজতে ভিজতে ছোট্ট সুজানা নদী হয়ে যাবে, বয়ে যাবে অরুন্ধতী হবে বলে, পাথর থেকে পাথরে আছড়াতে আছড়াতে। সমস্ত আঁচড়ের দাগ রয়ে যাবে নদীর শরীরে। অন্ধকারকেই আপন করে, প্রতিটি পরত আলাদা করতে, তার দিকে পলকহীন চেয়ে থাকবেন যতক্ষণ-না অন্ধকারের রহস্যভেদ হয়। এর পরেই তো বলা যায়, ‘Today, though, I am grateful for that gift of darkness. … … It turned out to be route to freedom, too…’। কিন্তু মুক্তি কী থেকে? স্থবির সমাজের হীন বন্ধন থেকে, সমষ্টি ও ব্যক্তির ভুল সম্পর্ক থেকে, এমনকি নিজের ভুল সঞ্চয়ের পিছুটান থেকে। তার জন্য প্রথমে তো মায়ের সত্তা-নিংড়ানো ব্যক্তিত্বের দাপট থেকে মুক্তি খুঁজতে হবে। বুঝতে হবে সেই প্রচণ্ড মর্জির ভিতর-মেজাজ। ছোট্ট মেয়ের কাছে তা ছিল প্রায় অসম্ভব এক চর্চা। অরুন্ধতী বলছেন,
I found it impossible to predict or gauge what would anger her and what would please her. I had to pick my way through that minefield without an amp. My feet and fingers and sometimes even my head were often blown up, but after floating around untethered for a while, they would magically reattach themselves.
ঐ ‘floating around untethered’, ঐ বন্ধনহীন, ‘লিপ্তিবিহীন’ ভেসে চলাই ছিল তাঁর টিকে থাকার, অরুন্ধতী হয়ে ওঠার জীয়নকাঠি।

কোট্টায়ামে রোটারি সদনের দুটি হল ভাড়া নিয়ে মিসেস ম্যাথিউস এবং মেরী রয় একটি নার্সারি স্কুল চালু করলেন। কিছুদিন পর শুরু হলো মতান্তর। ম্যাথিউস চাইতেন স্কুলটির ক্রিস্টান মিশনারি চরিত্র বজায় রাখতে, মেরী চাইতেন সেই গণ্ডি টপকে তাকে নিজস্বতা দিয়ে গড়ে তুলতে। জিতলেন মেরী রয়, যথারীতি। হয়ে উঠলেন ‘… the owner, headmistress and wild spirit of a unique school in a unique town’; এখন সে হয়ে উঠলো মেরী রয়ের স্কুল। ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো সে-প্রয়াস। দু-বছরের মধ্যে তিন-ঘরের এক পুরনো বাড়ি ভাড়া করে হোস্টেল চালু করলেন, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিজের দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতে শুরু করলেন সেখানে। এখন মেরী রয় আর ললিথ-সুজানার মা নন, সব শিশুদের মা তিনি। সবার সর্বস্ব তিনি। কিন্তু এই দিবারাত্রির শ্রম থাবা বসালো শরীরে। হাঁপানি বাসা বাঁধলো ফুসফুসে। মাঝে মাঝে তার প্রবল তাড়স একেবারে পেড়ে ফেলতো তাঁকে। নিদারুণ যন্ত্রণা তখন। সুস্থ নিশ্বাসের সজীবতা ফিরে পাওয়ার জন্য গোটা শরীরের আছড়ানি, রুগ্ন বুকের হাপর আতঙ্ক বুনে দিতো অরুন্ধতীর দেহমনে। মনে হতো এই বুঝি পড়েই গেল গাছটা। সেই নীল আতঙ্ক অসহায় অরুন্ধতীকে বলতো, ‘কী হবে এখন তোমার?’ মেরী রয়েরও ছিল একই প্রশ্ন –
‘Her wheeze asked (it) in a higher register: What will you do now, little girl? My reply was always I’ll breathe for you, Mama. I tried to breathe for her. I became her lungs. Her body. I attached myself to her in ways she wasn’t aware of. I became one of her valiant organs, a secret operative, breathing my life into hers’।
উল্টোটাই তো হওয়ার ছিলো, স্বাভাকিকভাবে। কিন্তু যা কিছু স্বাভাবিক, তার বিরুদ্ধেই তো মেরী রয়ের ওলোটপালোট অভিযান। তাই একলা অরুন্ধতীর সঙ্গে একলা মেরীর এই স্বপ্নসম্ভব সন্ধি। এর সবটা সাজানো ছিলো না। মেরী সত্যিই ভাবতেন, কী হবে মেয়ের, মেরীহারা মেয়ের! কে আশ্রয় দেবে তাকে? এই বিপন্নতা-বোধ থেকে মেরী রয় একটি পরিবারকে মনে মনে বেছে রেখেছিলেন, যেখানে তিনি হঠাৎ মারা গেলে অরুন্ধতী আশ্রয় পেতে পারেন। এবং, ‘The family didn’t know, of course, it was just speculation on my mother’s part, a secret plot between her and her valiant organ-child’।

শুধু এই গোপন নির্বাচনই নয়, এই কল্পিত বিপর্যয়ের মোকাবিলাতেও তো জিততে হবে মেরী রয়কে। তাই মাঝেমধ্যেই অরুন্ধতীর সপ্তাহশেষের দিনগুলো কাটতো সেই পরিবারের সঙ্গে, ওদের বাড়িতে, ওদের কাছে নিজেকে গ্রহণীয় করে তোলার দায় নিয়ে। সুবিধে ছিল, ওই পরিবারের এক বিধবা যুবতী মেরীর স্কুলে বাচ্চাদের দেখাশুনোর কাজ করতেন, তাঁর দুই সন্তান, অরুন্ধতীর প্রায়-সমবয়স্ক, পড়তো সেই স্কুলে। ফলে, ওদের সঙ্গে শান্ত সময় কাটতেই পারতো অরুন্ধতীর। কিন্তু ফুলের বনে তো শুধু ফুল ফোটে না, মৃত্যুও ফুটে থাকে দৃশ্যের আপাত-আড়ালে। ওদের ঠাকুর্দা ছিলেন এলাকার এক সম্মানীয় মানুষ, ক্রিসমাস পার্টিতে সান্তা সাজতেন, তাঁর ‘Ho! Ho! Ho!’ ধ্বনিতে সে পার্টি রঙীন হয়ে উঠতো। আর নিজের বাড়িতে সেই সান্তা অন্যরূপে ধরতে চাইতেন অরুন্ধতীকে।
There, when he caught me alone, which wasn’t hard because I was a reading child, the “Ho! Ho! Ho!” turned into a snuffling and a groping between my legs and a rolling-down of my underwear. I could tell that what he was doing was wrong and I sensed that it had something to do with having babies. And that I must escape. He was a lumbering, ungainly man and I always managed to get away. But still, it was a hunt, and I was his prey.
সমস্ত সাজানো বাগানের অন্তর্লীন অন্ধকারে এভাবে চলতেই থাকে শিকার-শিকারী খেলা; ‘অন‍্য’কে অসহায় শিকার বানানোর কারসাজি। শিকারী শিকার খোঁজে, শিকার চিনে নেয় সব লুকানো নখর — ‘While everybody else saw the kindly Kottayam Santa – loving, bumbling grandpa – I saw a human-size pig with glasses, a snorting wild boar sitting across the table from me at mealtimes’।

না, বুনো বরাহের এই শিকার-প্রবণতার কথা কাউকে বলতে পারে নি ছোট্ট মেয়েটি; দ্বিধা, অসহায়তা ছিল তার বাধা। সে শুধু শিখে নিয়েছিল টিকে থাকার কৌশল- কখনো একলা হবে না, সজাগ থাকবে, বই পড়বে না; লুকিয়ে থাকবে ভিড়ে, স্পষ্ট আলোয়। অন্ধকারে নয়, কারণ অন্ধকার তো তার মায়ের দান, ‘route to freedom’।

অরুন্ধতী আর মেরী যেন দুই চকমকি পাথর; কাছে এলেই অনিবার্য ঘর্ষণ, জ্বলে উঠতো মেরীর আগুন, তাতে পুড়ে ছাই হয়ে সেই ছাইয়ের মধ্যেই ছোট্ট অরুন্ধতী খুঁজে নিতো অরুন্ধতী রয় হয়ে ওঠার পরশপাথর। এই অন্তরঙ্গ দহনের প্রথম অভিজ্ঞতার একটু বিশদ বর্ণনা রইলো এখন।

ছ’বছরের অরুন্ধতী বসে আছে মায়ের পাশে, বিমানে। দুজনেরই প্রথম আকাশ-যাত্রা। ফিরছে চেন্নাইতে (তখন ম‍্যাড্রাস) মেরীর দিদি মিসেস জোসেফের বাড়ি থেকে। পাশাপাশি বসে তবু আরও কাছাকাছি আসার তাগিদ থেকেই হয়তো, সে প্রশ্ন করে বসলো মিসেস জোসেফ যদি মেরীর নিজের বোন হন, তাহলে মিসেস জোসেফ এতো রোগা কেন? জ্বলে উঠলো আগুন।
My mother turned on me in a rage and mimicked me. I felt myself shrinking from my own skin and draining away, swirling like water down a sink until I was gone. Then she said, “By the time you are my age you’ll be three times my size’.
মেয়ে জানতো ভয়ানক কিছু একটা বলে ফেলেছে সে, কিন্তু বোঝে নি অপরাধটা ঠিক কী, কারণ, “I was too young for ‘fat’ and ‘thin’ to be value judgements”।

অনেক পরে, সেদিনের ব‍্যক্তিগত অনুভূতি দূরে সরিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে পরিণত অরুন্ধতী বুঝতে পারেন আঘাতটা ঠিক কীভাবে বেজেছিল। কিন্তু সেদিনের সেই ব‍্যক্তিগত অনুভূতি কেমন ছিল?
‘And I turned on myself. I remember the air in the plane– there wasn’t any. … … It was a horrible plane full of horrible people in a horrible sky. I wanted it to crash and for all of us to die. I especially hated the spoiled children with doting parents. I was all for collective punishment’.

কিন্তু এই একরঙা অন্ধকারে ডুবে যাওয়াও তো মেরীর কন‍্যার নিয়তি হতে পারে না। হঠাৎ-জ্বলা সে আগুন হঠাৎই নিভে যায়। অল্পক্ষণ পরেই মেরী বলে ওঠেন, ‘I’m your mother and your father and I love you double’। ব‍্যস! সমস‍্যা শেষ। আগুন যখন নিভেই গেছে ছাইয়ের আর ভয় কী! —
।And then the plane was all right. The sky was all right. But my feet were still strangers to the sandals they wore. And there were still some unresolved issues:
If I was going to be three times her size, I would need three tickets to sit on. So, three free tickets.
Double. Triple. A maths class. A sum to solve.
এরপরই আসে এক অবাক-ন‍্যারেটিভ। নদী ফিরে আসে তার লুকানো ঘাটের কাছে, মুহূর্তের পুনর্জন্ম হয় —
What is double-love divided by triple-my-size multiplied by free tickets divided by careless words? A cold, furry moth on a frightened heart. That moth was my constant companion.

মেরী রয়ের স্কুল বড়ো হতে লাগলো, ললিথ আর অরুন্ধতীও। মায়ের স্কুলের গণ্ডি টপকে এবার বোর্ডিং স্কুলে যাবার পালা। মায়ের নির্মম অভিভাবকত্ব পেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে তো খুশি হবার কথা! অরুন্ধতী বলছেন, ‘I hated being sent away’। তবে কি সেই নিয়ত জায়মান টানাপোড়েনের এক ভিতর-টানও ছিল? সেই প্রবলতা আসলে ছিল ছক-ভাঙার প্রয়াস? এখন অরুন্ধতী জানেন, যে কোনো প্রথাসিদ্ধ ধারণাকে আক্রমণ করার ক্ষমতাই ছিল মেরীর জিতে যাওয়া। তাই স্নেহ-মায়া-পেলবতা দিয়ে তৈরি যে মাতৃত্বের ধারণা তাতে বাঁধা পড়া তাঁর পক্ষে ছিল অসম্ভব। ভালোবাসা দিয়ে মেয়েকে মানুষ-করা নয়, কঠোরতা দিয়ে, ভাঙচুর দিয়ে এক স্বাধীন নারী গড়ে তোলা হয়তো ছিল তাঁর অভিপ্রায়, যে নারী সুখের ফাঁদে পড়বে না কোনোদিন; শাসকের নয়, দুঃখীদের পাশে দাঁড়াবে বারংবার। অন্যদিকে, পুত্রের প্রতি তাঁর আচরণ ছিল অনেকটাই সরলরৈখিক। পুরুষের প্রতি, পুরুষ-ধারণার প্রতি তাঁর বিরাগের সমস্ত আঁচ পোয়াতে হতো ললিথকে। কারণ ললিথ ছিল তাঁর নাগালে থাকা একমাত্র পুরুষ, একমাত্র পুরুষ যাকে সমস্ত নারীর সব লাঞ্ছনার জন্য তিনি নিজে শাস্তি দিতে পারতেন। যে দেশে কন্যাভ্রূণহত্যা অতি-স্বাভাবিক, যেখানে পুত্র মানে গর্ব আর কন্যা মানে লজ্জা, সেধানে মেরী রয় এক দুর্লভ হেঁয়ালি। ‘মা’ হিসাবে নয়, সন্তানদের কাছে তিনি নিজেকে ‘নারী’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন সর্বদা। অরুন্ধতী বলছেন,
The corollary to son-worship is of course mother-worship. Ours is a land of mother-worshippers too. Or, more accurately, a land that deifies mothers who produce and then deify their sons. My brother and I grew up in the cleft between that syrupy dream and our capricious nightmare, not always knowing which was worse. On balance, if we had to choose between the two, I think I’d choose the nightmare, and he, the dream.

বোর্ডিং স্কুলে বড়ো হতে থাকলো ভাই-বোন। দু-ক্লাস ওপরে-নীচে। সেখানকার খরচ মেরী লগ্নি হিসাবে দেখতেন, দেখাতেন। বিনিময়ে দাবী ছিল যথাযথ প্রতিদান। সপ্তাহান্তে দুদিন মায়ের সঙ্গে দেখা, লম্বা ছুটিতে বেশিদিন। রেজাল্ট বেরোনোর পর আসতো ক্রিসমাসের লম্বা ছুটি। তখন তাদের দিন কাটতো মায়ের বোর্ডিং স্কুলে। এমন এক ছুটিতে, এক রাত্রে মেরী রয় ডেকে তুললেন ঘুমন্ত ললিথকে। ঘুমের মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে ললিথ পৌঁছলো তাঁর ঘরে। চুপিসাড়ে পিছু নিলো অরুন্ধতী। বন্ধ দরজার কী-হোলের মধ্যে দিয়ে দেখতে পেলো দাদার ওপর নেমে আসছে নির্দয় প্রহার, কারণ, “No son of mine comes home with a report that says ‘average student’”। মার চললো, যতক্ষণ-না মোটা কাঠের স্কেল ভেঙে যায়।
She raged at him without raising her voice above a whisper so as not to wake the other children in our hostel-home. The whispering made the whole thing even more terrifying. My brother didn’t react. That made her angrier. Finally, she grew tired, and he came back to his bed, quiet as death.

শৈশব-পেরোনো অরুন্ধতী ঘুমিয়ে থাকার ভান করছিল, দুজনেই জানতো সে ঘুমোচ্ছে না। পরদিন সকালে অরুন্ধতীর কপালে জুটলো মা’র আদর-আলিঙ্গন, এবং প্রশংসা, ‘You have a brilliant report’। এরপর এক গহন উপলব্ধি বিষণ্ণ ন্যারেটিভ হয়ে ঝরে পড়ে সেই বিক্ষত জীবনের তৃষার ‘পরে –
I was filled with shame. I hated myself. Since then, for me, all personal achievement comes with a sense of foreboding. On the occasions when I am toasted or applauded, I always feel that someone else, someone quiet, is being beaten in the other room. If you pause to think of it, it’s true, someone is.
মাটির পৃথিবী এভাবে জন্মায় – সাফল্যের উদযাপন তার লজ্জা, দাঁতে দাঁত চেপে মার সহ্য করে টিকে থাকার ক্ষমতা তার দীন অহঙ্কার।
মেরীর স্কুল এবার বাসা-বাড়ি ছেড়ে স্বভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হবে। তিন-একর জমিতে স্কুল-নির্মাণের জন্য আসবেন লরি বেকার নামে এক প্রথাভাঙা স্থপতি। অদ্ভুত উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন এই স্থপতি সস্তা উপকরণ দিয়ে টেঁকসই নির্মাণের যাদু জানতেন। অরুন্ধতী বলছেন,
Watching Baker’s buildings grow out of the earth almost like trees and plants fascinated me. I learned that design could evoke in me the same kind of joy in me as music, dance and literature.

স্থপতি হওয়ার ইচ্ছে দানা বাঁধলো অরুন্ধতীর মনে। এবার তিনি দিল্লী যাবেন, রাগ বা অভিমান নিয়ে নয়, বরং তাঁর হেঁয়ালি মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে –
।Between her bouts of rage and increasing physical violence, Mrs Roy told her daughter that if she put her mind to it, she could be anything she wanted to be.
এই আশীর্বাণী অরুন্ধতীর জীবনের সম্বল হবে, সব অন্ধকার, স্রোত, চোরাটান পেরিয়ে যাবার ভেলা হবে।

Delhi School of Planning and Architecture-এ ভর্তির পরীক্ষা দিতে সম্পূর্ণ অচেনা এক শহরে নামলেন ষোড়শী অরুন্ধতী, একা। হাতে শুধু এক পূর্ব-পরিচিতের ঠিকানা; সেখানেই মিললো সাময়িক আশ্রয়। দ্বিতীয় লিস্টে নাম ওঠার পর ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন আবার। এবার স্কুলের হোস্টেল তাঁর ঠিকানা। স্কুলের জীর্ণ গেট, ভিতরে ছড়িয়ে থাকা রাতজাগা-চোখ অগোছালো ছাত্রদল, সিগারেটের ধোঁয়ায় ধূসর কমন রুমের ভাঙা আসবাব মুহূর্তে আপন করে নিল অরুন্ধতীকে। এই প্রথম তাঁর মনে হলো মিসেস রয় মারা গেলে তাঁরও মরে যাবার প্রয়োজন আর নেই। হাল্কা অরুন্ধতী এই প্রথম, যেন শুধু নিজের জন্য শ্বাস নিতে শিখলেন। নিজের মধ্যে অনাঘ্রাত, অনাবিষ্কৃত এক ভূখণ্ড আভাসে ধরা দিল, তাকে আবিষ্কার করতে করতে এবার বড় হবেন তিনি।

সময়-চেতনা ছিল সেই পুষ্টির এক মূল উপাদান। মেরীকে হারানোর, নিজেকে হারানোর ভয় নিয়ে বেড়ে ওঠায় এতদিন চারপাশটা খুঁটিয়ে দেখার ফুরসৎ ছিল না তাঁর। অরুন্ধতী দিল্লি এলেন 1976-এ। ভারতবর্ষে তখন এক সঙ্কটকাল। দেশজোড়া অস্থিরতা সামাল দিতে ইন্দিরা গান্ধী জরুরী অবস্থা জা্রি করেছেন তার আগের বছর। 76-এ অন্ধকার আরও ঘন। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ দমনে নির্মমতর হয়ে উঠছে রাষ্ট্র। দিল্লির বস্তি গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে অসহায় মানুষের আন্দোলনের ওপর নেমে আসছে নির্দয় অত‍্যাচার, নিধন। নিজের ব‍্যক্তিগত ক্ষত-লাঞ্ছিত অরুন্ধতীর সময় লেগেছিল সমষ্টির যন্ত্রণা বুঝতে, সাড়া দিতে।
It took me a year to educate myself, orient myself, by which time the Emergency was over. In 1977 Mrs Gandhi called election and lost. I celebrated as though I had personally led the resistance.

এভাবে গভীর হবে নদী।

বন্ধুবৃত্ত ক্রমশ প্রসারিত হতে থাকল তাঁর। নানা ধাঁচের মানুষের সঙ্গে নানান ছন্দোবন্ধন মিলে মুক্ত হতে থাকলেন অরুন্ধতী। প্রথম রুমমেট ছিলেন নেপাল থেকে আসা হিলিসা ইয়ামি, যিনি পরে নিজদেশে মাওবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন। বন্ধু হলেন ওড়িশা থেকে আসা গোলক। দুজনে একে অপরের ভাষা জানেন না, তাই শুরু হলো ছবি এঁকে কথা-বিনিময়। ফের দেখা হলো ‘JC’-র সঙ্গে। আগে দেখা হয়েছিল যখন মেরী গেছিলেন, মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে, লরি বেকারের নির্মাণ-শৈলী দেখতে। ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন JC, লরির অধীনে শিক্ষানবিশ। গাড়িতে বসে আছেন মা-মেয়ে, গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছিলেন JC, অরুন্ধতীর সেদিনের যীশু–
He had long, lank, Jesus hair, a Jesus beard and a lean, flat, easy-walking Jesus body. … … As he came up to the van, he casually stubbed out the bidi he was smoking on the calloused heels of his boot. I died.
একটি কথাও সেদিন বলতে পারেন নি অরুন্ধতী।

এখন যীশু শিক্ষানবিশী শেষ করে ফেরা সিনিয়র ছাত্র, আর সেদিন একটিও কথা-না-বলা অরুন্ধতী এখন অনর্গল। এক সম্পর্কের তার বাঁধা হয় অল্পকালেই। ক্রমশ সম্পর্ক গাঢ়তর হবে, বিয়ে হবে। কখনো আলগা-খোলা, কখনো উথালপাতাল সময়ের মধ্যে চলবে তাঁদের যুগল উড়ান, যতদিন-না যীশু অরুন্ধতীকে নিয়ে ফিরে যাবেন গোয়ায়, নিজের জন্মভূমিতে। সেখানে কিছুদিন পর স্থিতির শান্ত ফাঁস অসহ্য হয়ে উঠবে অরুন্ধতীর কাছে। সমস্ত ভালোবাসা নিয়ে, সত্ত্বেও, সেই ফাঁস ছিঁড়ে আবার একলা ভেলায় ভেসে পড়বেন অরুন্ধতী, কেননা শৈশব তাঁকে শিখিয়েছিল সবথেকে ‘নিরাপদ’ আশ্রয় আসলে সবথেকে বিপজ্জনক, আর তাই নিরাপত্তা দিয়ে তৈরী ঘেরাটোপ ভেঙে বেরিয়ে পড়াই ছিল তাঁর মেরী-নির্মিত ভবিতব‍্য।

সবকিছু এখন নতুন অরুন্ধতীর কাছে—বন্ধুরা, হোস্টেল-জীবনের পাগলাটে বিশৃঙ্খলা, ইন্দ্রপ্রস্থ পাওয়ার স্টেশনের ধোঁওয়ায় ঢাকা ক্লান্ত আকাশ, বর্ষায় যমুনার নোংরা জল উঠে এসে বহু-পরিশ্রমে তৈরি ছবি, ট্রেসিং কাগজ ভিজিয়ে দেওয়া, সব। দেখলেন দিল্লির ধুলো-ঝড় – কেমন হঠাৎ আকাশ আধাঁর করে ঝড় ওঠে, উড়িয়ে নিয়ে চলে সাইকেল, চেয়ার, আবর্জনা, বোতলের ছিপি ইত্যাদি। অরুন্ধতীর মনে হলো, তিনিও ওইরকম এক বোতলের ছিপির মতো, তীব্র স্রোতে ভেসে দূরে সরে যাচ্ছেন কোট্টায়াম থেকে, তাঁর ‘valiant organ-life’ থেকে। একবছর পর মেরীর সঙ্গে যখন দেখা হল অরুন্ধতীর, মেরী তখন এক স্বাস্থকেন্দ্রে ভর্তি, দিন দশেক ধরে নিজের পছন্দের খাবার না পেয়ে বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। অরুন্ধতীকে দেখামত্র জ্বলে উঠলো চকমকি-আগুন। আগের মতোই, সারা বিশ্বের ওপর জমে থাকা রাগ উগরে দেওয়ার পাত্র হলেন অরুন্ধতী –
Her insults bore bored into me like a volley of bullets. My metaphoric execution ended with ‘You are a millstone around my neck. I should have dumped you in an orphanage the day you were born’.

কিন্তু এখন অরুন্ধতী দেখলেন, আগের মতো এক বাতাসহীন শূন্যতার মধ্যে দিয়ে আর ঝরে যাচ্ছেন না তিনি, সেই মথটা আর উড়ছে না। এক বছরে বড়ো হয়ে গেছেন তিনি। এই দূরত্ব থেকে এখন তিনি চিনতে পারবেন কোট্টায়ামকে, মাদার মেরীকে। বুঝবেন, ভয় আর অনুশাসন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ছোটবেলায়, অন্তত মেরীর স্কুলের ছাত্রীদের কাছে মুক্তির একটা আশা ছিল। মেরী রয়ের খামখেয়ালী স্পর্ধা ছিল সেই মুক্তির জীবন্ত মূর্তি, ‘She lit their path, she showed the way’। বুঝবেন, ঐ খামখেয়ালী স্পর্ধাই কেমন নির্মাণ-বিনির্মাণ খেলতো অরুন্ধতীর সঙ্গে —
‘Mrs Roy taught me how to think, then raged against my thoughts. She taught me to be free and raged against my freedom. She taught me to write and resented the author I became’।

দিল্লীর আলো-অন্ধকারে অরুন্ধতী বড়ো হতে লাগলেন দেশবিদেশের নাটক, সিনেমা দেখতে দেখতে, প্রফেসরদের সঙ্গে তর্ক করতে করতে এবং এক বিরাট শহরের বিভিন্ন ফাটল এবং ফাটলবাসী মানুষদের চিনতে চিনতে। প্রথম ছুটির অ্যাসাইনমেন্টের বিষয় বেছেছিলেন কেরালার মার্কসবাদী সরকারের জমিহীনদের-জন্য-বাড়ি প্রকল্পে তৈরি বাড়িগুলির নির্মাণ-নকসা পর্যালোচনা। প্রফেসরদের কাছে সে কাজ সমাদর পায় নি, পেয়েছিল তাচ্ছিল্য–
This, young lady, has nothing to do with what you are here to learn. You are here to study design not social service.
লরি বেকারের ‘গাছের মতো’ জন্ম-নেওয়া নির্মাণ-শৈলীর দর্শন, অরুন্ধতীকে যা টেনেছিল সুরের মতো, সাহিত্যের মতো, সে-দর্শন এই প্রতিষ্ঠানে ব্রাত্য, পরিত‍্যাজ‍্য। সেখানে সৌন্দর্যায়নের অভিজাত গমক-চর্চা, অরুন্ধতীর কাছে যা নিষ্প্রাণ। অনুরাগ আর বিরাগের এই সংঘাতের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকলো অরুন্ধতীর আহরণ, সঞ্চয়। দ্বিতীয় বছরের শেষে হোস্টেল ছেড়ে দিলেন (কারণ তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মেরীর কাছ থেকে অর্থসাহায্য আর নেবেন না), JC’র সঙ্গে উঠে গেলেন কাছের কলোনির একটা ঘরে, শুরু হলো ফাটল-বাস। নানান উদ্ভাবনী কৌশলে অভাব ঢাকতে ঢাকতে, রাতের পর রাত জেগে শেষ করলেন চূড়ান্ত থিসিস। সে থিসিসে ড্রয়িং, লেখচিত্র, ম‍্যাপ, ফোটোগ্রাফ থাকলেও মূলত তা ছিল নিবন্ধ, অনিবার্যভাবে তার শিরোনাম ছিল ‘Post-colonial Urban Development in Delhi: How the City Came to Be What It Is, and What It Does to Those Who Live in It’। বিষয়? অরুন্ধতী বলছেন,
My thesis was about ‘the City’ and ‘the Non-City’ — about ‘non-citizens’ who live in the cracks of the city, who are packed into the crevices of urban institutions and plans.

স্নাতক-পর্ব শেষ। একুশ বছরের অরুন্ধতী আবার বেরিয়ে পড়লেন। এবার JC’র সঙ্গে, গোয়া। সমুদ্রের ধারে একঘরের এক বাসস্থান ভাড়া নিলেন, বাড়িওয়ালা পরিবারের সঙ্গে কেকের ব্যবসা শুরু করলেন। ধীরে ক্লান্ত হতে শুরু করলেন অরুন্ধতী, পরিস্থিতি জটিলতর হলো যখন JC’র পুত্রস্নেহাতুর মা একসঙ্গে থাকতে শুরু করলেন ওই ঘরে, দড়িটা ছিঁড়লো যেদিন JC’র পরিচিত এক মনস্তত্ববিদ কাউন্সেলিং-এর অছিলায় একান্তে বললেন, ‘I know what women like you need. A good tight slap every now and then’; বললেন, ‘The thing about women like you is that you will do anything to get what you want. You’ll even sell your body’।

সেদিনই বাঁধন ছিঁড়ে অরুন্ধতী বেরিয়ে পড়লেন দিল্লি ফিরবেন বলে। পাথেয় নিজের একমাত্র গয়না, একটা আংটি, বেচে পাওয়া পাওয়া কয়েকশো টাকা। উঠলেন মুম্বাই (তখনকার বোম্বে)-গামী স্টীমারে। সহযাত্রী হিপিরা প্রায় সবাই কেকের খদ্দের হলেও এখন অরুন্ধতী একা! সাহস দিয়ে, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দিয়ে কোনোমতে সেই আঁধার-স্টীমার অক্ষত পেরিয়ে উঠলেন মুম্বাই-এর এক সস্তা হোটেলে। সেখানে আঁধার আরও গাঢ়। হাজার ধাক্কাতেও বন্ধ দরজা ভাঙবে না, শুধু এই ভরসায় রাত কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। সে-রাত কাটলো প্ল্যাটফর্মে। পরদিন টিকিট পেলেন দিল্লীর ট্রেনের। অরুন্ধতী জানেন, ‘My education, the class I came from, and, above all, the fact that I spoke English protected me and gave me options that millions of others did not have’; জানেন, ‘Those were the gifts bestowed on me by Mrs Roy’।

মিসেস রয়ের সঙ্গে তাঁর শেষবার দেখা হয়েছিলো দিল্লিতে দ্বিতীয়-বছর শেষের ছুটিতে। মেরী জেনেছিলেন JC’র সঙ্গে সম্পর্কের কথা। বাড়ি ফিরে জুটেছিলো শীতল লাঞ্ছনা। আনখশির বৈপরীত্যে ভরা মেরীর কাছে সে সম্পর্ক ছিল এক স্খলন। আগে এমনি এক স্খলনের সাহস দেখিয়েছিলো অরুন্ধতীর আদরে সারমেয়, ডিডো। অন্য এক সারমেয়র সঙ্গে সঙ্গমের ‘অপরাধে’ মেরীর আদেশে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো। মুখ-বুজে পীড়ন সহ্য করে অরুন্ধতী ডিডোর নিয়তি এড়াতে পেরেছিলেন, কিন্তু দিল্লি ফিরে চিঠিতে মাকে জানিয়েছিলেন দুটি সিদ্ধান্তের কথা – তিনি আর ফিরবেন না; মেরীর অর্থসাহায্য আর নেবেন না। আবার তাদের দেখা হবে সাত বছর পরে।

আবার দিল্লিতে একা অরুন্ধতী, এবার সম্বল ‘স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক’ – এই পরিচয়। সে-পরিচয় তাঁকে উপার্জনের সুযোগ দেবে, নিজের প্রতিভা বপন করার মাটি দেবে, জাগ্রত বীজ থেকে জন্ম নেবে ‘God of Small Things’।

দিল্লিতে ‘ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ আরবান অ্যাফেয়ার্স’-এ সাময়িক কাজ জুটলো অরুন্ধতীর, ইটালিয়ান বন্ধু কার্লোর কাছ থেকে ধার নিয়ে এক দরগার কাছে বাসা ভাড়া নিলেন। সাইকেল ছিলো তাঁর বাহন। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে বইতে বইতে, ভুল কোলাহলের চোরাবালির ওপর দিয়ে পাখির সজে চলতে চলতে একদিন দেখা হলো প্রদীপের সঙ্গে। প্রদীপ তখন নিজের লেখা চিত্রনাট্য থেকে সিনেমা বানাচ্ছেন ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের বরাত পেয়ে। সিনেমার নাম ‘Massey Sahib’। প্রদীপের ইচ্ছে সাইলা নামের নারীচরিত্রে অভিনয় করুন অরুন্ধতী। প্রাথমিক দ্বিধা, জড়তা কাটিয়ে রাজী হলেন অরুন্ধতী। সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করলেন বন্ধু কার্লো। চাকরী ছেড়ে প্রদীপের সঙ্গে হাজির হলেন পাঁচমারী পাহাড়ে, যেখানে সিনেমার স্যুটিং হবে। নদী বাঁক নিলো গভীর হবে বলে।

পাঁচমারী পাহাড়ে অরুন্ধতী শিখতে থাকলেন কীভাবে চিত্রনাট্য তৈরি হয়, কীভাবে চিত্রনাট্য ভেঙে দৃশ্যের নির্মাণ এবং পুনর্নির্মাণ হয়, কীভাবে দৃশ্যের সঙ্গে দৃশ্য, তার সঙ্গে সুর মিলে কাহিনীর অবয়ব হয়। পাঁচমারী পাহাড় ব‍্যস্ত তখন খুব। প্রদীপের তাড়া, স্বল্প-বরাদ্দ ফুরিয়ে যাওয়ার আগে সিনেমা শেষ করতে হবে। অরুন্ধতীর তাড়া, একমাস পরে তাঁকে ইটালি যেতে হবে। মুভি-পরবর্তী জীবনে সুরাহা পেতে কার্লোর সাহায্যে ইটালিতে ছমাসের একটি কোর্সে স্কলারশিপের আবেদন করেছিলেন অরুন্ধতী; বিষয়– মনুমেন্ট এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধের পুনরুদ্ধার। সে আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। সাইলার হাতে এখন একমাস সময়। ফলে এক রুদ্ধশ্বাস ব‍্যস্ততায় ঝড়ের মতো কাটতে লাগলো পাঁচমারীর দিনরাত্রি। আর সেই দমকা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে অরুন্ধতী পৌঁছে গেলেন প্রদীপের আরও কাছে।

সিনেমার কাজ শেষ, অরুন্ধতী ইটালিতে। মন পড়ে আছে ভারতে, পাঁচমারীতে। লক্ষ‍্যবিহীন দিনযাপন, আর প্রদীপের সঙ্গে কথা বলা, চিঠিতে। এমন এক চিঠির উত্তরে প্রদীপ লিখলেন, ‘Have you ever considered being a writer?’; অরুন্ধতীর ফিরে পেলেন শেষ গন্তব্যের ঠিকানা, তাঁর হারিয়ে-ফেলা নক্ষত্র-পোশাক। লেখক হওয়ার যে-ইচ্ছে ছোটবেলায় গুণগুণিয়ে উঠতো বারংবার, যে-ইচ্ছে চাপা পড়ে গিয়েছিল যাপনের ধুলোর নীচে, সে এবার বাণী পেল। এবার নদীতে বান আসবে, নদী তার সমস্ত আঁচড় এবং শুশ্রূষা, ঘাটে ঘাটে ফেলা আসা সমস্ত লুকোনো গল্প খুঁজতে খুঁজতে ফিরবে নিজের কাছে, জন্ম নেবে ‘God of Small Things’।

ইটালি থেকে ফেরা আর ‘God of Small Things’ এর জন্ম – মাঝে ছিলো অনেকটা সময়। অনেক অভিজ্ঞতা অরুন্ধতীকে সম্পৃক্ত করবে। মেরী রয়ের সঙ্গে আবার দেখা হলো আবার, মেরী রয় যখন এলেন ‘Travancore Succession Act’ এর বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টে লড়তে—মামলায় মেরী রয় জিতেছিলেন। শৈশবে ফেলে আসা বাবার সঙ্গে আবার দেখা হলো, মেরী রয়ের কথায় যিনি ছিলেন ‘a nothing man’। সমস্ত অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হবে তাঁর নিজের ভাষা খুঁজে পাওয়ার পাথেয়। তিনি জানতেন সে-ভাষা তাঁর কাছে এমনি আসবে না, শিকার করে, ছিঁড়ে খেতে হবে তাকে, তবে সে সহজে বইবে তাঁর শব্দশরীরে, রক্তের মতো –
It was out there somewhere, a live language-animal, a striped and spotted thing, grazing, waiting for me-the-predator.
দেখলেন ইন্দিরা-হত্যার পরবর্তী শিখ-নিধন, রাষ্ট্রের নৃশংস হত্যা-উল্লাস। অবশ, প্রকাশহীন অসহায়তায় ডুবে যেতে যেতে অরুন্ধতীর মনে হবে,
I felt I was watching it all from some other lonely, far-away planet. I didn’t realize that I – as I often did – had locked away my rage and disgust in a sealed chamber of my brain. I would unseal it much later, when I became a properly functioning human.

টুকিটাকি নানা কাজ ছাড়াও এবার শুরু হলো চিত্রনাট্য লেখা, প্রথমে প্রদীপের সঙ্গে যুগ্মভাবে, তারপর একক প্রয়াসে। তখন তিনি গন্ধ পেয়ে গেছেন শিকারের, নিজের ভাষার –
I knew that I hadn’t found the language-animal. But the bloodhound in me caught the faint, far-away scent of it on the breeze.

দূরদর্শন তখন নবীন অল্প বাজেটের কাহিনী-চিত্র নির্মাণের জন্য নবীন পরিচালকদের অর্থসাহায্য করছিলো। অরুন্ধতীর একটি চিত্রনাট্য পছন্দ হলো তাদের, প্রদীপ বরাত পেলেন সিনেমা বানানোর। তৈরী হলো ‘In Which Annie Gives It Those Ones’। মূলত কমবয়সীদের জন্য, তাদের ভাষায় লেখা সেই সিনেমা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করলো, দূরদর্শনে তো বটেই, দিল্লীর ইন্টারন্যাশন্যাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের প্যানোরামা বিভাগে প্রদর্শিত হলো, দুটি জাতীয় পুরস্কার পেলো, যার মধ্যে একটি ‘Best Screenplay Award’। অরুন্ধতী এখন খুঁজে পেয়ে গেছেন নিজের ভাষা, ‘language animal’।

অরুন্ধতী এখন ব্যস্ত। চ্যানেল-4 এর অর্থসাহায্যে প্রদীপের পরিচালিত সিনেমার চিত্রনাট্য লিখছেন, ‘সানডে’ ম্যাগাজিনে প্রকাশ পাচ্ছে তাঁর রচনা, রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রস্বীকৃত গুণীজনদের না-পসন্দ তালিকায় ক্রমশ উপরের দিকে উঠে আসছেন। মুক্তি পেলো ‘Bandit Queen’। অশান্ত অরুন্ধতী লিখলেন ‘The Great Indian Rape-Trick’, যা দুই পর্বে প্রকাশিত হলো ‘সানডে’তে। অরুন্ধতী লিখলেন,
Bandit Queen’ the film seriously jeopardizes Phoolan Devi’s life. It passes judgments that ought to be passed in Courts of Law. Not in Cinema Halls. The threads that connect Truth to Half-Truths to Lies could very quickly tighten into a noose around Phoolan Devi’s neck. Or put a bullet through her head. Or a knife in her back.
While We-the-Audience peep saucer-eyed out of our little lives. Not remotely aware of the fact that our superficial sympathy, our ignorance of the facts and our intellectual sloth could grease her way to the gallows.
We makes me sick.
অরুন্ধতীর এখন বন্ধু অনেক, শত্রুও।

এবার লেখা হবে ‘God of Small Things’। এক বছরেরও বেশী সময় ধরে লেখা বইটি প্রকাশের জন্য বিভিন্ন দেশের চল্লিশজন প্রকাশক অগ্রিম চুক্তি করলেন। সে অর্থের মিলিত পরিমাণ দশ লাখ ডলার। দিল্লীর স্কুলের বন্ধু গোলক, প্রদীপ আর হার্পার-কলিন্সের তখনকার কর্ণধার পঙ্কজ মিশ্র জানতেন সে বাণিজ্য সাফল্যের কথা। গোলকের প্রতিক্রিয়া ছিলো, অরুন্ধতীর কথায়, অমূল্য – ‘Good, Roy. Thank God we’re rich’। অরুন্ধতীর এখন কী হবে? আজন্ম-পলাতক অরুন্ধতী কি অর্থসুখে বাঁধা পড়বেন! মেরী রয়ের কন্যার পক্ষে তা ছিলো অসম্ভব। তিনি ছড়িয়ে পড়বেন ‘I’ থেকে ‘We’-তে, তিনি জানেন, ‘That was the best possible attitude towards money. Share it.’

বুকার পুরস্কার পেলেন অরুন্ধতী। পুরস্কার ঘোষণার পর একমাত্র যাঁকে অরুন্ধতী ফোন করেছিলেন, তিনি মেরী। মেরির প্রতিক্রিয়া ছিলো – ‘Well done, baby girl’। এর পরে থাক অরুন্ধতীর কথা –
An incredible expression of love. I’d caught her on a good day.
That night I dreamed I was a fish. A green hand reached into the water and picked me up. I don’t know why it was green. It held me up in the air and said, ‘Ask for anything. You can have it. What do you want?
I-the-fish said, ‘Please put me back in the river’.
ঘাট ছেড়ে বয়ে চলবে নদী।

এলো 1998, মিলিজুলি সরকার, নেতৃত্বে বিজেপি। একদিকে পোখরান পরমাণু পরীক্ষা, অন্যদিকে আদবানির রথযাত্রা। উঠলো হিন্দুত্বের অসুস্থ জিগির। বুকার-পাওয়া অরুন্ধতী দেশভক্তদের চোখে হয়ে উঠলেন ‘জাতীয় গর্ব’, হিন্দু জাতীয়তাবাদের উল্লাস। চুপ করে থাকলেই জাতীয় হিন্দু অমরত্ব। পারলেন না অরুন্ধতী। ‘আউটলুক’ এবং ‘ফ্রন্টিয়ার’ পত্রিকায় একসঙ্গে বেরলো তাঁর প্রবন্ধ, ‘The End of Imagination’। লিখলেন –
Why does it all seem so familiar? Is it because even as you watch, reality dissolves and seamlessly rushes forward into the silent, black-and-white images from old films – scenes of people being hounded out of their lives, rounded up and herded into camps? Of massacres, of mayhem, of endless columns of broken people making their way to nowhere?

শুরু হলো গণ-আক্রমণ, সুর তার ভীষণ চেনা – ভারত থেকে বেরিয়ে যান, পাকিস্তানে চলে যান ইত্যাদি। সাফল্যের, উদযাপনের, সোনার খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে এলেন অরুন্ধতী। এখন তিনি মুক্ত নারী। মুক্ত লেখনী তাঁর। মাদার মেরী যেমন চেয়েছিলেন।

অরুন্ধতী দেখবেন তাঁর জন্মভূমি কেমন সমস্ত মমতা ছুঁড়ে ফেলে রাষ্ট্র হয়ে উঠছে, উঠবে। একটা গোটা দেশ সব অর্জন ভুলে হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে চলবে পেছনের দিকে। অনেক রক্ত ঝরিয়ে, অশ্রু মাড়িয়ে, দাঙ্গা পেরিয়ে, নির্বাচন পেরিয়ে হয়ে উঠবে একটা প্রকাণ্ড খাঁচা যার অনেক ঘর, যে তার নাগরিকদের যাকে খুশি, যখন খুশি, যে-ঘরে খুশি বন্ধ করে দিতে পারে। প্রতিটি হেরে-যাওয়া মানুষের আর্তনাদ এখন অরুন্ধতীকে নিঃস্ব করবে, প্রতিটি লড়াই তাঁকে পথে নামাবে। আর্তনাদটা, লড়াইটা শুধু তো ‘ওদের’ নয়, অরুন্ধতীর মনে হতো কেউ যেনো ছোট্ট সুজানাকে বলছে, বলেই চলেছে, ‘Get out of my house’, ‘Get out of my life’।

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লেন তিনি। গ্রামে গ্রামে ঘুরে দেখলেন কেমন এক দানব ডুবিয়ে মারতে চলেছে এক প্রাচীন সভ্যতাকে, আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়ালেন, লিখলেন একাধিক প্রবন্ধ। তার মধ্যে প্রথমটি, ‘The Greater Common Good’ বেরোলো ‘আউটলুক’ এবং ‘ফ্রন্টলাইন’ পত্রিকায়, একসাথে। অরুন্ধতী লিখলেন–
I stood on a hill and laughed out loud.
… … …
Because suddenly I remembered the tender concern with which the Supreme Court judges in Delhi (before vacating the legal stay on further construction of the Sardar Sarovar Dam) had enquired whether Adivasi children in the resettlement colonies would have children’s park to play in. The lawyers representing the government had hastened to assure them that indeed they would, and what’s more, that there were seesaws and slides and swings in every park. I looked up at the endless sky and down at the river rushing past, and for a brief, brief moment the absurdity of it all reversed my rage and I laughed.

আরও বললেন যে, মুদ্রা নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির বাইরে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থ দেওয়া আর বিচারপতিদের বেতন হিসেবে অর্থের বদলে সমমূ্ল্যের সার দেওয়া একই। বেশ কিছুদিন পর ঐ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে, এক হাস‍্যকর অভিযোগে অরুন্ধতীর একদিনের কারাবাস হবে। কলমের যদি শিরদাঁড়া থাকে, তাকে রাষ্ট্র তখনো ভয় পেতো, এখনো পায়।

প্রকাশকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ, বুকার পুরস্কারের অর্থ, গ্রন্থস্বত্ব থেকে পাওয়া অর্থ– বিপুল এই ভারমোচনের ব‍্যবস্থা ইতিমধ্যে করে ফেলেছেন অরুন্ধতী। বিশ্বস্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য মানুষ নিয়ে যে ট্রাস্ট বোর্ড তৈরী হয়েছে সে অন্য কারও অর্থ গ্রহণ করবে না, শুধু প্রতি বছর তার তহবিলে জমা হবে অরুন্ধতীর গ্রন্থ স্বত্বের একটা ভারী পরিমাণ, সে অর্থ সাহায্য হবে সমস্ত পেশার সব মানুষের, যাঁরা ক্ষমতাস্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন।

এবার ‘অ্যান্টি-ন‍্যাশনাল’ অরুন্ধতী যাবেন দণ্ডকারণ‍্য। দেখবেন, একটা গোটা অরণ্য খনি-মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মুষ্টিবদ্ধ হাতের জনঅরণ‍্য, দেখবেন যে হাত রাষ্ট্রের কল‍্যাণ-মুখোশ খুলে তার সামনে আয়না তুলে ধরতে চায়, তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় আয়োজন। সে বুলেট-আয়োজন তখনো ছিল যেমন নির্মম, এখনো তেমন।

ইতিমধ্যে গাছটা আরও জীর্ণ, হলুদ কিছু পাতা-সম্বল। প্রায়শই দাদা ফোন করেন, বোন কেঁপে ওঠেন সেই অনিবার্য খবরের আশঙ্কায়, আর দাদা হেসে ওঠেন বোনের অকারণ উৎকন্ঠায়। সেই সেপ্টেম্বরে, সেই দিনেও দাদার ফোন এসেছিল, দাদা হাসেন নি সেদিন।

অরুন্ধতী যখন পৌঁছলেন তখন দিন ফুরিয়েছে, সব অর্থে। আলো পুনর্বার আসার পর, অন্ধকারের পর, মেরী রয় শুয়ে রইলেন ত়ার স্কুলের, তাঁর নিজস্ব অঙ্গনে; মরদেহে প্রণাম এঁকে দিলো তাঁর অগণিত আশ্রিতজন, কেউ পুরোনো ছাত্র, কেউ পুরোনো অভিভাবক, কেউ-বা পুরোনো সহকর্মী। অগণিত ছায়া পড়ে ছিল সে অঙ্গনে; অরুন্ধতী বলছেন,
I think Dido my Alsatian was there, too, with a bullet hole in her skull. I wonder what she would have thought about the message of condolence that came in from an old student, who worked as a senior special-effects technician in Hollywood: “She was more than a school principal to me. She was in equal measure a mother … she let me have a menagerie of animals in school … … not a single school I know would allow that”

তাঁর চিতাভস্মের খানিকটা ভাসানো হলো কাছের মীনাচিল নদীতে, বাকীটা সমুদ্রে। অরুন্ধতী দেখলেন, ঢেউ ছাই নিয়ে সরে যাচ্ছে পাড় থেকে, মেরী রয় চলে যাচ্ছেন এবং থেকে যাচ্ছেন চিরকালের জন্য –
I still see her clearly. All the time. She’s walking on the high seas. Through storm and stillness, through sunshine and rain. She’s walking when the tide is high, she’s walking when the tide is low. She’s walking when I wake up. And when I drift into sleep. … … …
Every now and then she stops as though she’s looking at herself in her bedroom mirror. Then she straightens her shoulders and walks on. The way she always did.
As for me, I stand on the shore, and look at her through the binoculars I’ve made with my hands.
The wind is picking up. I must straighten my shoulders too

পথ এখনো বাকি। সমস্ত জল, ঝরাপাতা নিয়ে বয়ে চলতে হবে একা। যতক্ষণ না সমুদ্র ডেকে নেয় ঢেউ-এর ওপারে।

Arundhati Roy
‘Mother Mary Comes to Me’
Penguin Random House India
Price: Rs. 899

Leave a Reply