You are currently viewing দিল্লির প্রতিবাদ আন্দোলন: গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন মোড়

দিল্লির প্রতিবাদ আন্দোলন: গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন মোড়

যোগেন্দ্র যাদব লিখছেন, 

‘শাসনব্যবস্থা — আর দীর্ঘদিনের নীরবতা’—আমাকে ভাবাত যে আমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছি— এই আশায় যে আবার দেখব… কিন্তু আজ — যে গণতান্ত্রিক স্পিরিটকে এতদিন চেপে রাখা হয়েছিল, সেটা আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে —আমি আবার সম্পূর্ণ বোধ করছি। সাময়িকভাবে হলেও। সোমবার (২০/০৭/২০২৬)  দিল্লির রাস্তায় যা দেখলাম, সেটা প্রসেস করতে রাত ৩টা পর্যন্ত জেগে ছিলাম। Vanya Vaidehi Bhargav X-এ যে লাইনগুলো পোস্ট করেছিলেন, তিনি একজন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, তিনি ঠিকই ধরেছেন কেন ২০ জুলাই ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে মনে রাখার মতো দিন।এই কলামে আমি বহুদিন ধরে বলে এসেছি, আমরা যখন প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদ থেকে নির্বাচনী স্বৈরাচারের দিকে যাচ্ছি, তখন বিরোধীদের ভোটের রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে প্রতিরোধের রাজনীতিতে যেতে হবে। যন্তর মন্তরের প্রতিবাদ ঠিক সেই রাজনীতি কেমন দেখতে হয়, তার ৬টা উদাহরণ।

১. সংখ্যা, ঠিক কতজন ছিল কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু আয়োজকরা ১৫,০০-২০,০০০ আশা করেছিলেন, …ড্রোনের ছবি বলছে ১ লক্ষেরও বেশি।  মূলত মিছিল হিসেবে শুরু হলেও তারপর সমাবেশ, তারওপর একটা বিশাল জনস্রোত। দুপুরের মধ্যে সংসদ এবং লুটিয়েন্স দিল্লির (Lutyens’ Delhi)  প্রায় সব রাস্তা প্রতিবাদকারীদের দখলে। এটা ছিল ভারতের “Occupy” মুহূর্ত। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়: এটা ছিল একদম অর্গানিক। ভাড়া করা ভিড় বা সংগঠনের জৌলুস নেই। যন্তর মন্তরের প্রতিবাদ ছিল প্রায় পুরোটাই স্বতঃস্ফূর্ত যুবকদের, যারা সোশাল মিডিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের খরচে, দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে এসেছে। শেষবার এরকম স্পন্টেনিয়াস মবিলাইজেশন দেখেছিলাম ২০২১ এর কৃষকদের ট্র্যাক্টর মিছিলে।

২. একদম ‘অসম্ভব’ বৈচিত্র্য। একজন বন্ধু একে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বৈচিত্র্য’ বলল। আমি দেখলাম—অরুণাচল প্রদেশ থেকে আসা একজন, হিমাচলের ধরমশালা থেকে একদল প্রাপ্তবয়স্ক, হুইলচেয়ারে বসা স্প্যানিশ ছাত্র, দেরাদুনের মেয়েদের দল, UP, বিহার, MP-র ছেলে-মেয়েরা, এলিট প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, জাতীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, “টাইমপাস” কলেজ, আর মুখার্জি নগরের মতো জায়গার ‘এস্পিরেন্ট’রা। মহিলাদের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো।এরা আপনার চেনা প্রতিবাদী মুখ না। অধিকাংশই প্রথমবার রাস্তায়। আর তাদের পরিবার কাল পর্যন্ত হয়ত বিজেপিকে সাপোর্ট করত। এটাই শাসককে ভাবাবে।

৩. মূল ইস্যুটা অনেক বড়, হ্যাঁ, NEET বাতিল আর CBSE কেলেঙ্কারিতে ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্র ছিল। সন্তান হারানো বাবা-মা ছিল। চাকরির জন্য, নিয়োগ দুর্নীতির শিকার মানুষ ছিল। কিন্তু সরাসরি ভুক্তভোগীর চেয়ে বেশি ছিল ‘সম্ভাব্য ভুক্তভোগী’— যারা বুঝেছে কাল তাদের পালা আসতে পারে, যারা বুঝেছে শিক্ষা-চাকরির ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়েছে।

৪. ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিরুদ্ধে রাগ শুধু টিপ অফ দ্য আইসবার্গ। আসল দাবী—সমতাপূর্ণ, অর্থপূর্ণ, মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং চাকরির সার্বিক অধিকার। ‌‘জয়প্রকাশ’ আন্দোলনের পর আধা শতাব্দী পর আবার কোনো যুব আন্দোলন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে জাতীয় এজেন্ডার কেন্দ্রে আনল।

৫. প্রতিরোধের ভাষা নাম-লেবেলের বাইরে সোনাম ওয়াংচুক নিশ্চিতভাবে তাদের হিরো, কিন্তু হিরো-ওয়ার্শিপ Anna আন্দোলনের মতো তীব্র না। যুবকরা CJP ও তার নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু সুস্থ সমালোচনা করতেও পিছপা না। তারা মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের কথা শুনেছে, চিয়ার করেছে, কিন্তু একজনের ব্যক্তিত্বে ভোলেনি। এই গণতান্ত্রিক স্পিরিট ভবিষ্যতের জন্য ভালো লক্ষণ।

৬. “Godi media, go back”— স্লোগান মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ন্যারেটিভের বাইরে যাওয়ার রাস্তা যুবকরা খুঁজে পেয়েছে। গত ১ মাস ধরে Noida-র চ্যানেল আর জাতীয় প্রেস যন্তর মন্তরের প্রতিবাদকে এড়িয়ে গেছে, না ব্যঙ্গ করেছে না খারাপ বলেছে।

(I was part of the protest march in Delhi, saw a democratic politics take a new turn,

Yogendra Yadav

The Indian Express, 22/07/2026 রচনার কিছু অংশ)

‘গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা প্রতিবাদ না।

রাষ্ট্র কিভাবে সাড়া দেয় সেটা’

তারুণ্যের প্রতিবাদ-সমাবেশ CJP – Cockroach Janata Party-র ডাকে। হাতে প্ল্যাকার্ড। ‘NEET বাতিল করো’। ‘শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করো’। ‘শিক্ষা বিক্রির জিনিস নয়, অধিকার’। ১২ বছরের জমা ক্ষোভ নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন, কারণ স্বপ্নের দরজা বন্ধ।

প্রথম কারণ: শিক্ষার বাজারিকরণ —২০১৪-র পর JNU, HCU, জামিয়া, TISS – সব ‘দেশবিরোধী’ হয়ে গেল। ফেলোশিপ বন্ধ। গ্রান্ট কাটা। ফি বাড়ল ৩০%। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইচ্ছে করে রুগ্ন করে দেওয়া হল। যাতে বেসরকারি কোচিং আর কর্পোরেট কলেজ ব্যবসা করতে পারে।

দ্বিতীয় কারণ: NTA এবং NEET-এর মৃত্যু। NTA তৈরি হয়েছিল স্বচ্ছতার জন্য। আজ সে দুর্নীতির প্রতীক। ২০২৪— ২৪ লাখ ছাত্র। পেপার ফাঁস বিহার, গুজরাট। ১৫৬৩ জনকে ‌‘গ্রেস মার্ক’। সুপ্রিম কোর্ট। CBI। কিছুই হল না। ২০২৬— ২ লাখ ভবিষ্যৎ ডাক্তার। পরীক্ষার ২ দিন পর খবর: ‘সততা নষ্ট। পরীক্ষা বাতিল’।

The Wire লিখল। The Hindu সম্পাদকীয় লিখল। Indian Express স্টিং করল। কিন্তু জবাবদিহি? শূন্য। 

তৃতীয় কারণ: লাশের সারি। সুইসাইড নোটে এক লাইন: ‘লাখ লাখ টাকা নেই। তাই ভবিষ্যৎ নেই’

স্লোগান: ‘যব যব মোদী ডরতা হ্যায়, হিন্দু-মুসলমান করতা হ্যায়’

Parliament Street-এর ৩ নম্বর ব্যারিকেড। ২০০-২৫০ জন ছাত্রছাত্রী বসে আছে। হাতে মোমবাতি, মুখে স্লোগান। দাবী একটাই —  সংসদের সামনে ১০ মিনিটের জন্য দাঁড়াতে দেওয়া হোক।

প্রথমে এল ১৫ জন পুলিশ। খাকি ইউনিফর্ম। তার পিছনে ৮-১০ জন সিভিল ড্রেস। মাথায় হেলমেট নেই, হাতে লাঠি। লাঠির মাথায় পেরেক বাঁধানো। অজিত সিং সামনে দাঁড়ালেন। গলা কাঁপছে কিন্তু কথা স্পষ্ট: ‌‘স্যার, আমরা ৪৮ ঘন্টা অনশনে। বাচ্চা ছেলেমেয়ে আছে। দৌড়াতে পারব না। আমাদের ১০ মিনিট সময় দিন। আমরা শান্তিতে ফিরে যাব।’ উত্তর এল লাঠি দিয়ে। প্রথম বাড়ি অজিতের বাঁ কাঁধে। দ্বিতীয়টা মাথায়। তিনি পড়ে গেলেন। সেই মুহূর্তে পিছন থেকে “চলো চলো” চিৎকার। টিয়ার গ্যাসের ৩টে শেল। সাদা ধোঁয়ায় ১০ সেকেন্ডে সব অন্ধকার। ১৬ বছরের ‌‘জন’ দম বন্ধ হয়ে বসে পড়ল। ওর পাশের মেয়েটা বমি করতে লাগল।

ধোঁয়া একটু কাটতেই শুরু হল আসল তাণ্ডব। প্রত্যক্ষদর্শী হাম্মাদ বলেন—  ‌‘যারা মারছিল তাদের মধ্যে ৫ জন ইউনিফর্মে ছিল। বাকি ১০-১২ জন জিন্স, টি-শার্ট। মুখে কাপড় বাঁধা। ওদের হাতে লাঠি ছাড়াও রড ছিল।’ ভিডিওতে দেখা যায়, একজন সিভিল ড্রেসের লোক হাম্মাদকে পিছন থেকে লাথি মারছে। হাম্মাদ মুখ থুবড়ে পড়েন। তারপর আরও ৩-৪ ঘা পিঠে। আলফাজুরের পা লক্ষ্য করে মারা হল। ‌‌‘উদ্দেশ্য ছিল যাতে আমরা দৌড়াতে না পারি,’ সে পরে বলেছিল। মেয়েদের দিকেও লাঠি গেছে। ১৯ বছরের এক ছাত্রী চিৎকার করে বলছিল: “ম্যাডাম আমি মেয়ে”। উত্তর: আরও জোরে লাঠি।

কিছু স্বেচ্ছাসেবক আহতদের Jantar Mantar-এর অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছিল। সেই রাস্তাটাও ছাড়ল না পুলিশ। নরেন্দ্র বলছিলেন—  ‌‘আমরা ৪ জন ধরাধরি করে ‌‘জন’কে নিয়ে যাচ্ছিলাম। ওর মাথা ফেটে রক্ত। হঠাৎ পিছন থেকে আবার লাঠি। আমার পিঠে, হাঁটুতে লাগল। জনকে ফেলে দিল।’এই সময় শুরু হল ‌‘উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া’। কালো জিপ। কোনো নাম্বার প্লেট নেই। ৭-৮ জন ছেলেমেয়েকে জোর করে তোলা হল। কোথায় নিয়ে গেল কেউ জানে না। ৬ ঘন্টা পর Parliament Street থানার সামনে ছেড়ে দেয়। ইন্টারনেট বন্ধ। ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ বুথের বাইরে ২ ঘন্টা— সবচেয়ে বর্বর অংশটা এখানে। হাম্মাদ অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলেন Parliament Street-এর একটা পুলিশ বুথের বাইরে। জ্ঞান ফিরল রাত ২টোয়। চারপাশে কেউ নেই। মাথা থেকে রক্ত পড়ছে। তিনি উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না।‌‘আমি ২ ঘন্টা ওখানে পড়ে ছিলাম। ৩-৪ বার পুলিশের গাড়ি গেল। কেউ জল দেয়নি, কেউ হাসপাতালে নিয়ে যায়নি। শেষে ৩টে নাগাদ ২ জন অটো ড্রাইভার দয়া করে Lady Hardinge-এ দিয়ে এল,’ হাম্মাদ বলেন। অজিত সিং চোখে টিয়ার গ্যাসের জন্য কিছু দেখতে পাননি। প্রায় ঘন্টা ছ’য়েক। ডাক্তার বললেন “Corneal irritation”। Lady Hardinge-এর জরুরি বিভাগে রাত ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ১১ জন ভর্তি। ৩ জনের মাথায় সেলাই। ২ জনের হাত ফ্র্যাকচার। বাকিদের আঘাত। 

প্রমাণ লোপাট

ভোরের দিকে পুলিশ এসে রাস্তা ধুয়ে দেয়। রক্তের দাগ, ভাঙা প্ল্যাকার্ড, জুতো— সব তুলে নেয়। CCTV ফুটেজ ‌‘টেকনিক্যাল কারণে’ পাওয়া যাচ্ছে না বলে থানা থেকে জানানো হয়। সকাল ৭টায় যখন প্রথম আলো ফোটে, Jantar Mantar আবার ফাঁকা।

পুলিশের বয়ান বনাম বাস্তবতা

সরকারি প্রেস নোট: ‌‘বেআইনি জমায়েত। নিয়ম মেনে ন্যূনতম বলপ্রয়োগ। ১০ জনকে প্রতিরোধের জন্য আটক। কেউ গুরুতর আহত নয়।’

বাস্তবতা: লাঠি: সাধারণ লাঠি না। পেরেক বাঁধানো, রড। টার্গেট: যারা জল বিলি করছিল, যারা আহতদের ধরছিল তাদেরই বেশি মারা হয়েছে। সিভিল ড্রেস: পুলিশ অস্বীকার করলেও ৭টা আলাদা ভিডিওতে সিভিল ড্রেসের লোকদের মারতে দেখা গেছে। চিকিৎসা: “কেউ গুরুতর নয়” বলা হলেও Lady Hardinge-এ ২ জনকে ২৪ ঘন্টা observation-এ রাখতে হয়। 

The Indian Express-এর প্রথম পাতা: “Day after injured, back at Jantar Mantar protest site: ‘Weak in body, not in resolve’

এই সনয়কালের তিনটে প্রশ্ন তুলেছেন ওঁরা 

প্রশ্ন ১: সমাবেশের অধিকার — সংবিধানের ১৯(১) (বি) । শান্তিপূর্ণ সমাবেশ মৌলিক অধিকার। সরকারের দয়া না।

প্রশ্ন ২: সংসদের ভূমিকা—রাস্তায় যখন লাঠি চলছে, তখন লোকসভা-রাজ্যসভায় আলোচনার নোটিশ খারিজ হচ্ছে। শশী থারুর লিখলেন: “যে রাষ্ট্র নিরস্ত্র প্রতিবাদীকে ভয় পায়, সে নিজের কথার উপর আস্থা হারিয়েছে”

প্রশ্ন ৩: রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া— ৫৯ বছরের সোনাম ওয়াংচুককে “চিকিৎসার” নামে তুলে নিয়ে যাওয়া। বিরোধী সাংসদকে আটক। এটা সংলাপ না। এটা ভয়।

দিল্লি থেকে কোটা, পাটনা, কলকাতা—আগুন ছড়াল। কোটা: ১০ হাজার ছাত্র। কোচিং বয়কট। “No Paper Leak. No Death”। ১২ জন আহত।

পাটনা: রেল অবরোধ।  ‘পরীক্ষা দেব। সিট কিনব না’।

কলকাতা, কলেজ স্কোয়ার: মোমবাতি মিছিল। পুলিশ বলল ‘অনুমতি নেই’। 

মুম্বাই: মেডিকেল ছাত্ররা কালো ব্যাজ। ‘আমরা ডাক্তার হতে চাই, দালাল নয়’।

মিডিয়া: কে কথা বলবে? জাতীয় টিভি:৩০ সেকেন্ড। পাশে ‘ডিজিটাল শিক্ষা’”র বিজ্ঞাপন।

ছাত্ররা নিজেরাই মিডিয়া হল। WhatsApp, X, Instagram।

পোস্টার: ‘এটা পরীক্ষার লড়াই না। এটা স্বপ্ন বাঁচানোর লড়াই’।

আমরা আরশোলা। গ্যাস দিলে কাশব। মারলে উঠব। ব্যান করলে নতুন একাউন্ট খুলব।

আমাদের দাবী:

১. সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে SIT তদন্ত

২. শিক্ষামন্ত্রীর নৈতিক পদত্যাগ

৩. শিক্ষাকে পাবলিক গুড হিসেবে ঘোষণা

শেষ লাইনটা অজিত স্যারের: ‘সরকার চুপ। কিন্তু আমরা ছাত্রদের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব।’

মঙ্গলবার (২১/০৭/২০২৬) যন্তর মন্তরের প্রতিবাদস্থলে ফিরে এলেন অনেকে— ৩০ বছরের অজিত সিং থেকে ২১ বছরের আলফাজুর মহম্মদ, ১৮ বছরের জন থেকে ২২ বছরের নরেন্দ্র, ৩০ বছরের হাম্মাদ। কেউ খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন, কারও হাতে-মাথায় টাটকা ব্যান্ডেজ। স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের ছোট করে দেওয়া মঞ্চের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, যেটা এখন অস্থায়ী ত্রাণ শিবির। 

অজিত সিং, ৩০ পশ্চিম বিহারে থাকেন। B.Ed এর ছাত্রদের কোচিং করান। সোমবার রাতে Lady Hardinge Hospital থেকে ছাড়া পেয়েই আবার প্রতিবাদে যোগ দিতে এসেছেন।

আলফাজুর মহম্মদ, ২১  গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ৩ দিন আগে ট্রেনে দিল্লি এসেছেন। পায়ে চোট নিয়েও তিনি আবার প্রতিবাদস্থলে ফিরেছেন। 

জন, ১৮, সোমবার যন্তর মন্তর থেকে ফেরার সময় লাঠির আঘাতে মাথায় ব্যান্ডেজ। সে বলে— ‘আজ যদি লড়াই না করি, তাহলে দেশ ছেড়ে বিদেশে পড়তে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’

নরেন্দ্র, ২২, হরিয়ানায় একটি জেনারেল স্টোরে কাজ করেন। সোমবার Parliament Street-এ মিছিলের সময় পিঠ, হাঁটু ও হাতে চোট পান। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় Lady Hardinge Hospital থেকে ছাড়া পেয়ে সোজা প্রতিবাদস্থলে চলে আসেন। হাম্মাদ বলেন— ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো বদল দেখছি না। তাই বদল চাইতেই এখানে এসেছি। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত প্রতিদিন যন্তর মন্তরে আসব।’

(সংবাদসূত্র: The Indian Express, 22/07/2026)

উদিত মিশ্র এক লেখায় জানালেন

গত তিন দিন ধরে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর যথেষ্ট মনোযোগ কেড়েছে। কারণ তথাকথিত “Cockroach Janata Party”-র নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু হতাশ যুবক সেখানে জড়ো হয়েছে। তাদের দাবি কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ২০২৬ NEET-UG প্রশ্নপত্র ফাঁস। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এই পরীক্ষা দেয়। এটাই প্রথমবার নয় যে NEET-এর প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, আর এটাই একমাত্র পরীক্ষা নয় যেখানে এমন ঘটনা ঘটেছে। রিপোর্ট বলছে গত এক দশকে ভারতে হওয়া বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্যে ১৫০টির বেশি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে কারণ এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে জবাবদিহির অভাব। The Indian Express-এর সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানে গত দুই দশকের ৪৫ টি বড় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা খতিয়ে দেখা হয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষায় অন্তত ১ লক্ষ আবেদনকারী ছিল। এই ৪৫ টির মধ্যে মাত্র দুটি মামলায় দোষীদের সাজা হয়েছে। বেশিরভাগ মামলাই হয় আইনি জটিলতায় আটকে আছে, নয়তো একদম বন্ধ হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে, পরীক্ষা ফাঁসের অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকেই এখন উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার প্রতিনিধি।…Union Budget-এ শিক্ষা মন্ত্রকের জন্য বাজেট বরাদ্দ পরীক্ষা করা যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো বড় মন্ত্রকের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ বাড়বেই। কারণ একই জিনিস ও পরিষেবার দাম বছরে বছরে বাড়ে, অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি। কোনো মন্ত্রক বা দপ্তর নীতিগতভাবে গুরুত্ব হারালো নাকি বাড়লো সেটা বোঝার মাপকাঠি হল মোট বাজেটের কত % তারা পাচ্ছে।… এই বিশ্লেষণে শেষ অর্থবর্ষ পর্যন্ত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। তথ্যের শুরুর বছর ২০০৯। কারণ Centre for Monitoring Indian Economy-র Economic Outlook মডিউলে ওই বছর থেকেই তথ্য পাওয়া যায়। তথ্য জোড়া দিলে প্রথম ১২ বছরের NDA সরকারের সময় শিক্ষা মন্ত্রকের আপেক্ষিক গুরুত্ব, বা গুরুত্বের অভাব, স্পষ্ট হয়ে ওঠে। … ২০০৯-১০ সাল থেকে Union Budget দেখলে স্পষ্ট যে গড়ে প্রতি বছর মোট বাজেটের আকার ১০.৪% করে বেড়েছে। এর মানে সরকার প্রতি বছর আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০% বেশি খরচ করেছে। ফলে বেশিরভাগ মন্ত্রক ও দপ্তরের বাজেট বরাদ্দও বেড়েছে।…  ফোকাস হল মোট বাজেটে সেই মন্ত্রকের অংশ বেড়েছে, কমেছে, নাকি একই আছে।… শিক্ষা আগে ছিল মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক। এই মন্ত্রকের অধীনে থাকা দুটি দপ্তরের অংশও দেখা হয়েছে: School Education এবং Higher Education। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক এই  দুটি মন্ত্রকের তথ্য প্রসঙ্গত এসেছে।  কারণ সাধারণ মানুষজন  স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দ দাবি করে আর রাস্তা ও মহাসড়ক বৃদ্ধির মডেলকেও তুলে ধরে। তথ্য দেখাচ্ছে যে Union Budget-এ শিক্ষা মন্ত্রকের অংশ ২০১৩-১৪ সালে ছিল ৪.৬% (কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন UPA সরকারের শেষ বছর)। সেটা ২০২৫-২৬-এ নেমে হয়েছে ২.৫%। অন্য কথায়, PM মোদী ক্ষমতায় আসার আগে শিক্ষা মন্ত্রকের যে অংশ ছিল, এখন তা তার অর্ধেক। বিদ্যালয় শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা — দুটি দপ্তরের ক্ষেত্রেই আপেক্ষিক অংশ কমেছে। School Education দপ্তরের অংশ ১২ বছর আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। শিক্ষা মন্ত্রকের বাজেটের অংশ ২০১৩-১৪-এ ৪.৬% থেকে কমে ২০২৫-২৬-এ ২.৫% হয়েছে। রাস্তা ও মহাসড়ক তৈরিতে অর্থের অংশ গত ১২ বছরে প্রায় তিনগুণ বেড়ে ৫.৮% হয়েছে।… এই সব তথ্য থেকে যে ছবি উঠে আসে তা প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন কেনেথ গ্যালব্রেইথের কথারই প্রতিধ্বনি করে: ‘আমি জিনিসের উপর বেশি বিনিয়োগ এবং মানুষের উপর কম বিনিয়োগ করার আমাদের যে প্রবণতা তাই নিয়ে চিন্তিত।”

(সরকার কোথায় টাকা খরচ করার সিদ্ধান্ত নিল/উদিত মিশ্র, CMIE, Indian Express Research ২২/০৭/২০২৬)

NEET এবং শিক্ষার উপর এক পদ্ধতিগত আক্রমণ 

ডি রাজার লেখায় বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে, তাদের শিক্ষানীতি তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত লক্ষ্য দ্বারা চালিত হয়েছে: শিক্ষার বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ এবং কেন্দ্রীকরণ। ফল হয়েছে পাবলিক শিক্ষার পদ্ধতিগত দুর্বলতা এবং পরীক্ষা, নিয়োগ ও কর্মসংস্থানে অভূতপূর্ব সংকট। ধর্মেন্দ্র প্রধানের নেতৃত্বাধীন শিক্ষা মন্ত্রক এই ব্যবস্থায় আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। হাজার হাজার ছাত্র রাস্তায় নেমেছে, তার পদত্যাগ দাবি করছে। কর্মীরাও ২ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অনশনে বসে জবাবদিহি চাইছেন। আক্রমণ শুরু হয়েছিল দেশের প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি দিয়ে; জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছিল। 

সরকারকে প্রশ্ন করা ছাত্র ও শিক্ষকদের নিয়মিতভাবে ‌‘দেশবিরোধী’, ‌‘টুকড়ে-টুকড়ে গ্যাং’ বা ‌‘আরবান নকশাল’ বলে চিহ্নিত করা হত। এর সঙ্গে ছিল পাবলিক শিক্ষার উপর আর্থিক চাপ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অনুদান কমা, ফেলোশিপে দেরি, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং ফি বাড়ানোর চাপের কথা জানিয়েছে। বিজেপির শিক্ষানীতির প্রথম স্তম্ভ ছিল পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করা। দ্বিতীয় স্তম্ভ হল পরীক্ষা ও নিয়োগের বিশ্বাসযোগ্যতার পতন। আর এই পতনের প্রতীক হল ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি – NTA। NEET সংকটই এখন মূল উদাহরণ। 

২০২৪ সালে— ২৪ লাখের বেশি প্রার্থী পরীক্ষা দিয়েছিলেন। পেপার লিকের অভিযোগ, ১৫৬৩ জনকে বিতর্কিতভাবে গ্রেস মার্ক দেওয়া, একাধিক ‌‘পারফেক্ট স্কোর’, দেশব্যাপী প্রতিবাদ, CBI তদন্ত এবং সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ানোয় পরীক্ষা ব্যবস্থার উপর জনআস্থা ভেঙে পড়ল। NEET-UG ২০২৬— প্রায় ২ লাখ ভবিষ্যৎ ডাক্তারকে নিয়ে হওয়া পরীক্ষাটি বাতিল করতে হল কারণ পরীক্ষার সততা নষ্ট হয়েছিল। শুধুমাত্র  NEET এবং NTA সংকটের মাত্রাই—প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে। প্রতিটি বাতিল পরীক্ষার পিছনে একটা মানবিক খরচ আছে। প্রতিটি বাতিল পরীক্ষার পিছনে আছে বছরের পর বছর প্রস্তুতি, পরিবারের সঞ্চয় এবং আবেগের বিনিয়োগ— যা রাতারাতি উধাও হয়ে যায়। ভারত বারবার দেখেছে পরীক্ষার চাপ ও নিয়োগের অনিশ্চয়তার মধ্যে ছাত্রদের আত্মহত্যার হৃদয়বিদারক খবর।

Credit: photo:Alnitak-Alnilam-Mintaka/Wikimedia Commons(CC BY-SA 4.0). Cropped by KALODHVANI

অরুন্ধতী রায়

আরশোলা-গণতন্ত্র : নিরস্ত্র ও বিপজ্জনক

বহু বছর পর এই প্রথমবার ভারতীয় হিসেবে অদ্ভুত একটা ভালো লাগা কাজ করছে। যখন মনে হচ্ছিল সব আশা শেষ, ঠিক তখনই ওরা এল। বৃষ্টির মধ্যে ছুটে আসা একদল তরুণ আরশোলা। একজন বিচারক এবং এক শ্লেষের অশুভ মিলনের ফসল।

গল্পটা আমাদের সবারই জানা, তবুও নথিবদ্ধ করে রাখার স্বার্থে আরেকবার বলছি। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক অহংকারী ও অবজ্ঞাপূর্ণ মন্তব্যের জবাবে— যেখানে তিনি বেকার ভারতীয় তরুণদের ‘আরশোলা’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন—বোস্টন-প্রবাসী ছাত্র অভিজিৎ দিপকে ইনস্টাগ্রামে লিখেছিলেন: “যদি সব আরশোলারা একজোট হয়, তাহলে কেমন হবে?” লক্ষ লক্ষ মানুষ এতে সাড়া দেয়। আর এভাবেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা আরশোলা জনতা পার্টি। দিপকে হয়ে ওঠেন আরশোলাদের সেই জাদুকর বাঁশিওয়ালা। তাদের প্রথম দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, যিনি এমন এক দুর্নীতিগ্রস্ত ও পচা মন্ত্রণালয়ের মাথায় বেশ আত্মতুষ্টি নিয়ে বসে আছেন, যেখান থেকে নিয়মিতভাবে সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়। বিরোধী দলগুলোর মতে, ২০১৪ সাল থেকে এমন ফাঁসের সংখ্যা প্রায় ১৫২টি। এই প্রশ্নফাঁস লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর জীবন তছনছ করে দিয়েছে, যারা বছরের পর বছর এই পরীক্ষাগুলোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এদের অনেকের বাবা-মা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে এবং পরীক্ষায় বসার ফি দিতে গিয়ে নিজেদের জমি বা বাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। এটা এক ধরনের অভিনব আইনি তোলাবাজি। সম্প্রতি ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET) বা নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের পর, চরম হতাশা ও ভেঙে পড়া ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।

আরশোলাদের ক্ষোভ যখন অনলাইনে সুনামির আকার ধারণ করছে, তখন ৬ জুন বোস্টন থেকে ফিরে সোজা বিমানবন্দর থেকে দিল্লির বিখ্যাত প্রতিবাদ-মঞ্চ যন্তর মন্তরে পৌঁছে যায় দিপকে। লাদাখের সুপরিচিত সমাজকর্মী ও শিক্ষাসংস্কারক সোনম ওয়াংচুক তার সঙ্গে যোগ দেন এবং আমরণ অনশনের ঘোষণা করেন। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA) বা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মার্ক্সবাদী- লেনিনবাদী (লিবারেশন) ছাত্র সংগঠনের ছয়জন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া—নেহা বোরা, মণীশ কুমার, আমীন অমিতাভ, দানিশ আলি, হৃষিকেশ এবং দীপক—ঘোষণা করে যে তারাও অনশন করবে, এবং তারা পাশের একটি মঞ্চে অবস্থান নেয়। অন্যান্য শহরেও প্রতিবাদ শুরু হয়। অনশনকারীদের অবস্থা যখন সংকটজনক হতে শুরু করে, তখন ইন্টারনেট তোলপাড় করে দেওয়া তরুণ আরশোলারা বাস্তবে যন্তর মন্তরে জড়ো হতে থাকে। ককরোচ জনতা পার্টি ঘোষণা করে যে ২০ জুলাই, সংসদের বাদল অধিবেশন শুরুর দিন তারা সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা করবে। নির্ধারিত পদযাত্রার দু’দিন আগে, পুলিশ সোনম ওয়াংচুককে মঞ্চ থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং প্রথমে একটি সরকারি হাসপাতালে, পরে তাঁর স্ত্রীর জোরাজুরিতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে বন্দি করে রাখে। তিনি এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০ জুলাই সকালে, পদযাত্রার দিন, আইসা (AISA) শিক্ষার্থীরা তাদের অনশন ভঙ্গ করে।

আরশোলারা রাজধানী শহরকে ঝড়ের বেগে দখল করে নিল। ট্রেন, বাস, বিমান, মেট্রো—সব পথে তারা আসতে লাগল, প্রতি ঘণ্টায় তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকল। দিল্লির বর্ষণমুখর আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফোটার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই হাজার হাজার সংখ্যায় তারা যন্তর মন্তরে জড়ো হতে শুরু করল। সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মরিয়া ও ক্ষুব্ধ তরুণদের একটা আস্ত প্রজন্ম—যাদের চোখের সামনে তাদের ভবিষ্যৎ নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে—তারা তাদের বাবা-মা ও ঠাকুরদা-দিদিমাদের ছেড়ে দেওয়া অধিকার পুনরুদ্ধার করতে চলেছে: মানুষ হিসেবে এবং একটা দেশ হিসেবে আমাদের মর্যাদা। একটা গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার। আন্দোলনকারীরা তাদের অসীম সাহস, শালীনতা এবং রসবোধের মাধ্যমে সেই ক্ষতিকারক ভয়কে দূর করে দিয়েছে, যা আমাদের সবার মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। দিনের শেষে এটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল যে, আন্দোলনকারীরা বা তাদের নেতারা যা দাবি করছিল, এই প্রতিবাদ তার চেয়ে অনেক বড় কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ধর্মেন্দ্র প্রধান এখন একেবারেই তুচ্ছ বিষয়। আসল লড়াইটা আরও অনেক বড়। শাসনব্যবস্থার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত যে পচন ধরেছে, তা এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান এবং একটা পচা লাশের মতো দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। এমনকি সাত-আট বছরের সবচেয়ে ছোট্ট আরশোলাটাও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই কথাটা বুঝিয়ে বলতে পেরেছে।

মিছিলের ঠিক কয়েকদিন আগে তড়িঘড়ি ও প্রায় গোপনীয়ভাবে একজন নতুন পুলিশ প্রধান নিয়োগ করা সত্ত্বেও এবং আমাদের ভয়ংকর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভয়ংকর দক্ষতা নিয়ে চিন্তিত ফিসফাস থাকা সত্ত্বেও, ২০ জুলাই দিল্লিকে গ্রাস করা এই সুনামির তীব্রতা মাপতে পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তারা সবরকম চেষ্টা করেছিল। বাস, রাস্তা এবং মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছিল। তাতে কোনো লাভ হয়নি। তারা ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ারও চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ইন্টারনেটে অভ্যস্ত এই তরুণ আরশোলারা মিম আর ভিডিওর বন্যা বইয়ে দিয়ে তাদের সেই প্রচেষ্টাকে কোনোভাবে ব্যর্থ করে দিয়েছিল—এমনসব ভিডিও, যা আপনাকে একইসাথে কাঁদাবে এবং হাসাবে। বিশ্বের সব জায়গার মধ্যে খোদ দিল্লিতে, আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণীরা বলছিল যে তারা এই ভিড়ের মধ্যে নিজেদের নিরাপদ বোধ করছে—যদিও পুলিশের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেছে কয়েকজন। আমরা দেখেছি মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ—সব জাতি ও শ্রেণির মানুষ একজোট হয়ে পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একে অপরকে সাহায্য করছে, একে অপরকে রক্ষা করছে। আমাদেরকে জ্ঞান দেওয়ার বা বড় বড় ভাষণ দেওয়ার বদলে, তারা আমাদের দেখিয়ে দিল, প্রমাণ করে দিল—আমাদের স্বপ্নের সেই সুন্দর, সম্ভাব্য ভারতটাকে।

এই বিপদ সামাল দিতে পুলিশ তাদের হলুদ রঙের লোহার ব্যারিকেডগুলো ঝালাই করে আটকে দেয়, এবং তাদের পরীক্ষিত পুরনো সরঞ্জাম নিয়ে আসে: পাথর বোঝাই ট্রাক এবং আগে থেকেই ভাঙাচোরা গাড়ি। আশা ছিল, এর মাধ্যমে তারা এমন একটা পরিস্থিতি সাজাতে পারবে যেন মনে হয় তরুণেরা সহিংস হয়ে উঠেছে এবং পুলিশ কেবল আত্মরক্ষার জন্যই পদক্ষেপ নিচ্ছে। লাঠি ও রড হাতে সাদা পোশাকের একদল গুন্ডাবাহিনী নিয়ে আসে তারা। পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF) তাদের উর্দি থেকে নেম-ট্যাগ খুলে ফেলে। অনুগত মূলধারার টিভি চ্যানেলগুলো লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, মিথ্যা খবর প্রচার করার জন্য প্রস্তুত হয়ে। (কেউ কেউ অতি উৎসাহে এমন কিছু প্রচার করতে শুরু করেছিল, যা তখনও ঘটেইনি। ভারতে খবর সাধারণত বর্তমানের বদলে ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি হয়।) কোনো কিছুই কাজে আসেনি। পুলিশ এবং র‍্যাফ বেপরোয়াভাবে লাঠি চালিয়েছে, বাচ্চাদের মাথা ফাটিয়েছে এবং হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। তারা কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে। কিন্তু তরুণরা এগিয়ে যেতেই থাকে। সোজা সংসদের দিকে। ঠিক যেখানে তারা যাবে বলে জানিয়েছিল, সেদিকেই। তারা কাছাকাছি আসতেই নিরাপত্তাবাহিনী পজিশন নিয়ে নেয়, তাদের একে-৪৭ বন্দুকগুলোর নিশানা ছিল নিরস্ত্র ছাত্রদের দিকে। তবুও, আরশোলারা এগিয়ে চলে। আর এই এগিয়ে চলার মাধ্যমেই তারা সরকারের লৌহকঠিন মুষ্টিকে ঢেকে রাখা মখমলের দস্তানার শেষ চিহ্নটুকুও ছিঁড়ে ফেলে এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থা আসলে কী এবং চিরকাল কেমন ছিল, তা তারা সবার সামনে উন্মোচিত করে দেয়—এক ফ্যাসিবাদী লৌহকঠিন মুষ্টি। এমন একদল পাশবিক মানুষের জোট, যাদের নিজেদের শাসিত দেশের ইতিহাস এবং বৈচিত্র্য বোঝার কোনো ক্ষমতাই নেই। এই মানুষগুলো কেবল ঘৃণা করতেই জানে, কিন্তু ভালোবাসতে বা ভাবতে জানে না।

আন্দোলনকারীরা কাছাকাছি আসতেই আমাদের সাহসী ও দাম্ভিক প্রধানমন্ত্রীকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সংসদ সদস্যদের চকচকে নতুন সংবিধান সংসদ ভবন থেকে বের হতে বাধা দেওয়া হয়, যে ভবনের একমাত্র উদ্দেশ্যই মনে হয় প্রতিদিন সংবিধানকে অবমাননা করা।

সন্ধ্যার মধ্যে পুলিশ প্রতিবাদ স্থলের মূল মঞ্চটি ভেঙে দেয়। রাতের মধ্যেই মানুষ আবার তা দখল করে নেয়। রাতের মতো পুলিশ পিছিয়ে যাওয়ার সময় আরশোলারা তাদের দাঁড়িয়ে সম্মান জানায় (স্ট্যান্ডিং ওভেশন)। বাচ্চাদের মারধর করার জন্য। বাহ মোদীজি! বাহ!

এর থেকে বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশা করা বোকামি। কিন্তু এটাকে নিছক একটা আবেগঘন মুহূর্ত বলে উড়িয়ে দেওয়াটাও হবে চরম নির্বুদ্ধিতা। এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে, সংবাদমাধ্যম এবং চিৎকার-চেঁচামেচি করা টিভি চ্যানেলগুলো বিদেশি অর্থায়ন আর সিআইএ (CIA) চক্রান্তের মতো গালগল্প এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বে মেতে উঠেছে। একজন গর্বিত ‘আন্দোলনজীবী’ হিসেবে (মোদী আমার মতো মানুষদের ব্যঙ্গ করে এই নামেই ডাকেন) আমি স্বীকার করছি যে, যখন এসব শুরু হয়েছিল, তখন আমিও সতর্ক ছিলাম। আমার ভয় হচ্ছিল যে আমরা হয়তো আরেকটি আন্না হাজারে মুহুর্তের দিকে এগোচ্ছি—২০১১ সালের সেই তথাকথিত দুর্নীতিবিরোধী গণআন্দোলন—যার প্রাথমিক উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, শেষমেশ তা আমাদের এমন এক রাজনৈতিক দলের তিন মেয়াদের শাসন উপহার দিয়েছে, যে দলটা এই দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। এমন একটা দল, যারা রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের এবং ভারত সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখে না, যারা দেশ বা তার নাগরিকদের কাউকেই সম্মান করে না, এবং যারা আন্তর্জাতিক স্তরে আমাদের লজ্জিত করে ভারতকে নতজানু করে দিয়েছে।

কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমের তাদের প্রতি যে বৈরিতা, সেটা দেখেই ককরোচ জনতা পার্টি নিয়ে আমার সব সন্দেহ দূর হয়ে যায়। সেটাই ছিল আমার কাছে প্রথম এবং সবচেয়ে আশ্বস্ত করার মতো লক্ষণ। আমি এটা জেনে রোমাঞ্চিত ছিলাম যে অভিজিৎ দিপকে একজন দলিত সম্প্রদায়ের ছেলে, আর সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চিত ছিলাম এই ভেবে যে, কেউ এই বিষয়টার উপর মনোযোগ দিচ্ছিল না। আমার কাছে সবকিছু পাল্টে যায় যখন আমি তাকে বলতে শুনি, “আমার নাম যদি খালিদ হতো, বা আমি যদি একজন মুসলিম হতাম, তাহলে এতক্ষণে আমি জেলে থাকতাম।” ভারতে বাস্তবে কীভাবে কাজ হয়, সেই নোংরামিটাকে প্রকাশ্যে আনার মতো সাহস তার ছিল—এই সত্যটা যে, আমাদের দেশে সবকিছু (এমনকি এবং বিশেষ করে আইন) সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয় না। সবকিছু সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আপনার ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, জাতিসত্তা এবং লিঙ্গের ওপর। এটা ছিল সহজভাবে বলা একটা গভীর পর্যবেক্ষণ। যেখানে বিরোধীরাও ‘হিন্দু ক্ষোভ’-এর ভয়ে ‘মুসলিম’-এর বদলে ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ বলতে বাধ্য হয়, সেখানে প্রকাশ্যে তার এমন একটা কথা বলা আমাকে সাথে সাথে যন্তর মন্তরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আমি এটাও জানতাম যে দিপকে যখন ‘খালিদ’ নামটা বেছে নিয়েছিল, তখন সে হয়তো জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) গবেষক উমর খালিদের কথাই বলছিল, যে শারজিল ইমাম এবং আরও অনেকের সাথে প্রায় ছয় বছর ধরে বিনা বিচারে জেলে বন্দি। উমরের অপরাধ? ২০২০ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সময় তিনি আন্দোলনকারীদের অহিংস থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন, ঠিক সেই সময়টাতে যখন হিন্দু রক্ষক গুণ্ডাদের উসকানিতে অগ্নিসংযোগ, খুন এবং মসজিদে আগুন লাগানোর ঘটনায় দিল্লি কেঁপে উঠছিল, আর নীরব পুলিশ সেটা দাঁড়িয়ে দেখছিল, ক্ষেত্রবিশেষে নিজেরাও অংশ নিচ্ছিল। বিচারকদের কাছে জামিনের একের পর এক আবেদন খারিজ হয়ে গেছে, যারা কোনটা ঠিক সেটা করার—বা বোঝার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন বলে মনে হয়।

আরশোলারা যখন পদযাত্রা করছিল এবং তাদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছিল, তখন আমি মনে মনে ভাবছিলাম: ভাগ্যিস এরা বেশিরভাগ মুসলিম, বা শিখ, বা খ্রিস্টান, বা আদিবাসী নয়। তাহলে এদের পিষে ফেলা হতো, মেরে ফেলা হতো, গুলি করা হতো, বা জেলে ভরা হতো। ভাগ্যিস এরা কাশ্মীরি নয়। তাহলে এদের অন্ধ করে দেওয়া হতো (যদিও কেউ কেউ ছররা গুলির আঘাত পেয়েছে)। ভাগ্যিস এরা বেশিরভাগই হিন্দু। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিটা ঠিক এতটাই করুণ। তবে, এক মিনিটেই সবকিছু বদলে যেতে পারে। আমরা এখন যাকে বলে একটি “বিকাশমান পরিস্থিতি”-র মধ্যে রয়েছি। অন্যান্য রাজ্য থেকে হাজার হাজার আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ান উড়িয়ে আনার খবর আসছে। আমরা জানি না আগামী দিনগুলো কী নিয়ে আসবে।

এসবের পর আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব? আন্না হাজারের আন্দোলনের মতো শত শত কর্পোরেট মালিকানাধীন টিভি চ্যানেলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে ২৪ ঘণ্টা উন্মাদ কভারেজ ককরোচ জনতা পার্টির নেই, তাদের ভরসা বলতে কেবল তারা নিজেরা এবং ইন্টারনেট। আন্না আন্দোলনের মতো, যার ভেতর ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) তার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল এবং মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সেই টিভির তৈরি উন্মাদনাকে ভোটে কাজে লাগানোর জন্য দরজায় কড়া নাড়ছিল, এখানে আরশোলাদের আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো সংগঠিত বিরোধী দল ডানা গুটিয়ে অপেক্ষা করছে না। আমরা যে স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ দেখতে পাচ্ছি তা মিলিয়ে যাবে, যদি না কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক কাজ শুরু হয়। যদি না প্রাপ্তবয়স্করা এবং বিরোধী দলগুলো তাদের নিজেদের মধ্যকার মারামারি আর তুচ্ছ ঝগড়া থামিয়ে কিছুটা একতা দেখায়। সরকার জানে যে এর সম্ভাবনা খুবই কম। তারা নির্বিকার, কারণ তারা মনে করে যে তাদের শুধু অপেক্ষা করতে হবে। রাষ্ট্র অপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ পারে না।

এই মুহূর্তে ভারত জুড়ে চলা বেশ কয়েকটি প্রতিবাদের মধ্যে আরশোলা-অভ্যুত্থান অন্যতম। মধ্যপ্রদেশে আদিবাসীরা কেন-বেতওয়া নদী-সংযোগ প্রকল্পের প্রতিবাদ করছে। উত্তরাখণ্ডের গ্রামবাসীরা নির্বিচারে গাছ কাটার প্রতিবাদ করছে। গ্রেটার নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদ করছে মানুষ। মণিপুর ফুটছে। চাকরি উধাও হয়ে যাচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। ক্ষোভ দানা বাঁধছে। আর বিজেপি-আরএসএসের ‘ঈশ্বর’ নিয়ে খেলাটা আসলে কী, তা ধরা পড়ে যাচ্ছে। একটা ধাপ্পাবাজি। গ্যাংস্টার-চালিত একটা স্বর্ণ-সন্ধান (গোল্ড-রাশ)। অযোধ্যার রাম মন্দির লুটপাট আমাদের চোখের সামনে একটা জঘন্য বলিউড চিত্রনাট্যের মতো ফুটে উঠছে: মসৃণ চেহারার ধর্মগুরু আর দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকরা হোটেল বানাচ্ছে, জমিজমা জমাচ্ছে, এসইউভি (SUV) হাঁকিয়ে ঘুরছে, আর গরিব ও নিরীহ মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে নিজেদের পকেট ভরাচ্ছে। দুর্নীতি আর প্রকাশ্য দিবালোকে ডাকাতির জাল একেবারে ওপরতলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

আরশোলাদের এই শক্তি কি আমাদের এই খাদ থেকে টেনে তুলতে পারবে? কাজটা সহজ নয়। ভারতের গণআন্দোলনের পরিণতির দিকে একবার চোখ বোলালে খুব একটা আশার আলো দেখা যায় না। এটা হলো ক্রমশ ছোট হয়ে আসা আকাঙ্ক্ষা আর ভাঙা স্বপ্নের এক ধারাবাহিক ইতিহাস। ষাট ও সত্তরের দশকে বিভিন্ন আন্দোলন—যার মধ্যে নকশালদের সশস্ত্র বিদ্রোহও ছিল—কৃষকদের হাতে সম্পদ ও জমি বণ্টনের দাবি জানিয়েছিল। তাদের নির্মমভাবে দমন করা হয়। আশি এবং নব্বইয়ের দশকে, সামাজিক আন্দোলনগুলো, বিশেষ করে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন এবং পরে অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ডের মাওবাদীরা কৃষক ও আদিবাসীদের জমি থেকে উৎখাত করার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। অন্য কথায়, গরিবদের কাছে যা কিছু সামান্য অবশিষ্ট ছিল, অন্তত সেটুকুকে কেড়ে না নেওয়ার জন্য তারা দাবি জানাচ্ছিল। তাদেরও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০০০-এর দশকের মধ্যে, অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে ১০০ দিনের কাজের গ্যারান্টি প্রকল্প বা এনরেগা (NREGA)-তেই তারা সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হয়। ন্যূনতম মজুরিতে তিন মাসের কর্মসংস্থানের অধিকার—যে টাকায় কোনো শহরের দামি রেস্তোরাঁয় একবেলার ভালো খাওয়া হয় মাত্র। বর্তমান সরকার সেটাও শিকেয় তুলে রেখেছে, আর তার বদলে মানুষকে টিকে থাকার মতো সামান্য রেশন দেওয়া হচ্ছে—মোদীর ছবি আঁকা থলেতে করে—যা চলন্ত গাড়ি থেকে ভিক্ষুকদের দিকে ছুড়ে দেওয়া ভিক্ষার মতো, আর এর বিনিময়ে তারা চায় মানুষের কৃতজ্ঞতা এবং ভোট। অর্থনীতি ডুবতে থাকায়, এখন এটাও বিপন্ন।

আজ, ২০২৬ সালে, আমাদের অবস্থা এমন জায়গায় এসে ঠেকেছে যে, কেবল নিজেদের ভোটাধিকার আর নাগরিকত্বের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (NRC) জোট হলো হিন্দু রাষ্ট্রের সেই নাৎসি জার্মানির ১৯৩৫ সালের নুরেমবার্গ আইনের সংস্করণ, যার মাধ্যমে থার্ড রাইখ জার্মান নাগরিকদের তাদের “পৈতৃক নথিপত্র”-এর ওপর ভিত্তি করে নাগরিকত্ব দিত। (ভারতে কতজনের কাছে এই নথিপত্র আছে?) ব্যাপক বিক্ষোভের পর প্রতিবাদীদের হত্যা আর কর্মীদের কারাবন্দি করার মধ্য দিয়ে সিএএ-এনআরসি (CAA-NRC) বিরোধী আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়। তবে সেই প্রতিবাদের জেরে সরকার নতুন আইনগুলো কার্যকর করার গতি ধীর করে দেয়। কিন্তু এখন, সিএএ-এনআরসি—যাকে অনেকেই ঠিকঠাকভাবেই মূলত মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বলে বিশ্বাস করত—তা আবার ফিরে এসেছে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর ছদ্মবেশে। আমাদের খুব সাধারণভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আমাদের পাসপোর্টও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হচ্ছে। গোটা দেশ হন্যে হয়ে “পৈতৃক নথিপত্র” খুঁজছে। আমরা জানি না আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। আমরা কি বৈধ? নাকি অবৈধ? আমাদের কি কোনো অধিকার আছে? আমাদের মধ্যে কাদের জায়গা হবে “সন্দেহভাজন নাগরিকদের” জন্য তৈরি করা ওই বিশাল বন্দীশিবিরগুলোতে (ডিটেনশন সেন্টার)? আমরা কি আমাদের বাকি জীবনটা এক ট্রাইব্যুনাল থেকে অন্য ট্রাইব্যুনালে দৌড়েই কাটাব? ফ্যাসিস্টরা তো বিশৃঙ্খলা আর বিভ্রান্তি ভালোবাসে।

আমাদের আতঙ্ক আর যন্ত্রণা হয়তো আমাদেরকে এই আরশোলা-অভ্যুত্থানের ওপর অতিরিক্ত আশা বাঁধার দিকে ঠেলে দিতে পারে। অনেকেই ইতোমধ্যে একে বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কায় শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের অভ্যুত্থানের সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা ঘটার জন্য ভারত অনেক বেশি বিশাল একটা দেশ। অন্যেরা আবার একে ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীকে ক্ষমতাচ্যুত করা জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের সাথে তুলনা করছেন। এই তুলনাগুলো খুব একটা কাজে আসবে না। ককরোচ জনতা পার্টি এগুলোর কোনোটাই নয়। এটা একেবারেই নিজস্ব একটা ব্যাপার। বর্তমান সময়ের একটা অনন্য সৃষ্টি। এটি হলো একদল অরক্ষিত তরুণের লড়াই—এমন এক নিষ্ঠুর, প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকারের বিরুদ্ধে যারা বিরোধীদের প্রতি বিন্দুমাত্র দয়া না দেখানোর প্রমাণ রেখেছে। নিশ্চয়ই প্রতিশোধ নেওয়ার ছক কষা হচ্ছে এবং যাদেরকে মূল প্ররোচনাকারী বলে মনে করা হবে, তাদের ওপর সেই আঘাত নেমে আসবে।

যে শাসনব্যবস্থা স্পষ্টভাবে চরম অ-জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, তারা কোন সাহসে সেই মানুষদেরই কোনো ছাড় না দেওয়ার স্পর্ধা দেখায়, যারা তাদের ভোট দিয়েছিল? সম্ভবত এই কারণে যে, তারা বিশ্বাস করে নির্বাচন নামক ব্যবসাটাকে তারা সফলভাবে নিজেদের আয়ত্তে এনে ফেলেছে। তারা পুরো ব্যবস্থাটাকেই কবজা করে নিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের গঠনতন্ত্রেই ত্রুটি রয়েছে এবং তাদের নিরপেক্ষতার ওপর আর ভরসা করা যায় না। ইভিএম (EVM) ম্যানেজ করা হয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে এখন লক্ষ লক্ষ বাস্তব মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে আর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে লক্ষ লক্ষ ভূতুড়ে নাম, নির্বাচন পরিচালনাকারী আমলারা নিজেদের সম্পূর্ণভাবে এর সহযোগী হিসেবে প্রমাণ করেছেন, জঘন্যতম অনিয়মের ক্ষেত্রেও চোখ বন্ধ করে থাকা বা দেরি করার জন্য আদালতের ওপর নির্ভর করা যায়, নিরপেক্ষতা কী জিনিস তা পুলিশের ধারণাতেই নেই, ক্ষমতার করিডোরে কেউ তুড়ি বাজালেই সংবাদমাধ্যম নতজানু হয়ে পড়ে। নির্বাচনী এলাকাগুলোকে নতুন করে সাজানো হতে চলেছে যাতে সবসময় বিজেপিরই সুবিধা হয়। তাহলে শাসক দলের ভয় পাওয়ার কী আছে? কেন তারা কারও কথা শুনবে? তারা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজনৈতিক দল, যাদের পেছনে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শিল্পপতিরা। তারা যেকোনো কিছু কিনতে পারে। এবং যেকোনো কাউকেই। অন্তত তারা তা-ই বিশ্বাস করে।

কিন্তু এই খেলা কি অনন্তকাল ধরে চলতে পারে? সবাইকে কি সব সময় বোকা বানিয়ে রাখা যায়? দেড়শ কোটি মানুষের একটা দেশকে কি অনন্তকাল ধরে লাশের মতো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? সম্ভব নয়। আরশোলারা এখন বেরিয়ে পড়েছে। কৃষকরা আবারও দিল্লির দিকে পদযাত্রা শুরু করেছে, এবার তারা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদ করছে—যেই মৃত্যু পরোয়ানায় ভারত সরকার দাসসুলভ আনুগত্যে কৃষকদের হয়ে সই করতে রাজি হয়েছে। শহরের সীমানা সিল করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা দিয়ে তাদের থামানো যাবে বলে মনে হয় না। হয়তো আমাদের বাকিদেরও কৃষকদের আর আরশোলাদের কাছ থেকে কিছুটা বিপজ্জনক হয়ে ওঠার শিক্ষা নেওয়া উচিত। তরুণেরা আমাদের একটা উপহার দিয়েছে। তারা যা করেছে, সেটাকে সফল করে তোলার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার, আমাদের প্রত্যেকের।

একবার কোনো প্রধানমন্ত্রী শারীরিকভাবে পালিয়ে গেলে, রাজনৈতিকভাবেও তার পালাতে খুব বেশি দেরি হতে পারে না। তবে এই শাসনব্যবস্থা সহজে যাবে না। রাজধানীর রাস্তায় এমন অপমান তারা সহ্য করবে না। আমাদের হয়তো রক্তপাত দেখতে হতে পারে। তরুণদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে। সেই তারুণ্যে ভরপুর, ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন মেজাজ হারিয়ে পুলিশকে গুলি চালানোর অজুহাত করে দিতে আর কতক্ষণ? তারা আমাদের ভাঙার জন্য সবরকম চেষ্টাই করবে। আর তাদের আটকাতে আমাদেরও সম্ভাব্য সবকিছু করতে হবে।

(সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নেওয়া)

নতুন করে বেইজ্জতি হওয়া থেকে সাবধানতা

The Supreme Court on Friday (24/07/2026) passed an interim order prohibiting the extraction, editing, dissemination, reposting, uploading or monetisation of audio and video recordings of judicial proceedings on social media and other digital platforms without prior permission from the concerned court.

উত্তাল কলকাতাঃ ২৪শে জুলাই, ২০২৬ 

খবর পেয়েছিলাম ফেসবুক মারফত। বামপন্থী ছাত্রদের ডাকে মিছিল হবে শিয়ালদা থেকে ধর্মতলা। এ মিছিল দিল্লিতে চলতে থাকা সিজেপির ধর্ণা-আন্দোলনের সমর্থনে, এই রাজ্যের ছাত্র ছাত্রীদের সংহতি জ্ঞাপন। এ ডাক যৌবনের ডাক। এ মিছিল জেন জি’র মিছিল। আমরা পঞ্চশোর্ধ্ব চার বন্ধু গিয়ে পৌঁছেছিলাম শিয়ালদায়, সেই মিছিলে যোগ দেব বলে। আমাদের সঙ্গে রয়েছে উনিশ বছর আগে নন্দীগ্রাম মিছিলে হাঁটার স্মৃতি, বা সদ্য আর জি কর আন্দোলনের। 

আমরা সাড়ে তিনটেয় শেয়ালদায় পৌঁছাই। সামনে তাকালে শুধু মাথা আর মাথা। ওদিকে একটা করে ট্রেন শিয়ালদা ঢুকছে অথবা মেট্রো, হইহই করে জুটে যাচ্ছে এক দঙ্গল জেন জি! বন্ধুর রসিকতা, আমাদের নেবে তো? খানিকটা এগোই। বি আর সিং হাসপাতাল। দাঁড়িয়ে পড়ি। আবার এগোই। মৌলালি। এবার আর এগোবার উপায় নেই। ভিড়ের  ভেতর নিজেকে সেঁধিয়ে মিছিলের তালে যতটা এগিয়ে যাওয়া যায়! এই ভাবেই ধর্মতলা। পাক্কা দু’ঘন্টায়! 

আইসা, এসএফআই, আরওয়াইএল, ডিওয়াইএসএল, সিপিআইএম, কংগ্রেস, সবাই এসেছিলেন পতাকা নিয়ে। লাল পতাকার পাশে তেরঙ্গা। তার পাশে আরশোলার ছবি! নানা রঙের, নানা মতের পোস্টার। মূল দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। যার যেমন সামর্থ্য, সেই অনুযায়ী এ ফোর পেপারে হাতে লেখা পোস্টারও এসেছে বিস্তর। বিষয় ও ভাষায় বুদ্ধিদীপ্ততা,  কোনোটাতে যৌবনের প্রতিস্পর্ধী ভাষা। 

স্লোগান, গান, হাততালি, ড্রাম বাজানো – জনতার মুখরিত সখ্যে শিয়ালদা থেকে ধর্মতলার রাস্তা উত্তাল! পথচলতি মানুষ, অফিস বা গেরস্থের বারান্দা, জানলা থেকে উঁকি মারা মানুষের মুখের অভিব্যক্তিতে প্রচ্ছন্ন সমর্থন এই সন্তানদের প্রতি! 

কর্পোরেশন অফিসের বেশ খানিকটা আগে বিজেপির একদল “সমর্থক” হাতে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে, প্ররোচিত করতে। প্রভাবিত হলো না আগুয়ান মিছিল! ধর্মতলায় পৌঁছে দেখা গেল এক খুদেকে, বাবার কাঁধে চড়ে নানা রঙের মানুষ দেখছে!  

ফেরার মেট্রো ধরলাম পৌনে ছ’টা নাগাদ। কোথাও কোনো গণ্ডগোল, উস্কানি নেই! আছে একবুক পরিতৃপ্তি।           

গণআন্দোলন

গণআন্দোলন জন্ম দেয় অদ্ভুত অলৌকিক সব মুহূর্ত এবং দৃশ্যের। যে মুহূর্ত বা যে দৃশ্যের দেখা সাধারণ সময়ে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এতই অবাস্তব সেগুলো। অথচ গণআন্দোলনের মুহূর্তে সেই অবাস্তবগুলোই হয়ে ওঠে সহজ সত্য। যেমন এই দৃশ্যটি।  দিল্লির সিজেপি আন্দোলনের সমর্থনে, দিল্লিতে ছাত্রছাত্রীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে মুম্বাইয়ের জেনজি’রা গতকাল প্রতিবাদে নেমেছিল। বিজেপি শাসিত ডবল ইঞ্জিন মহারাষ্ট্র। স্বাভাবিক ভাবেই পুলিশ প্রতিবাদীদের ধরে ধরে গ্রেফতার করে। টেনে পুলিশ ভ্যানে তোলে। গাড়ি চলতেও শুরু করেছিল। তারপরেই ঘটে গেলো অদ্ভুত ঘটনাটি। রেনকোট পরিহিতা একটি রোগা পাতলা মেয়ে গাড়ির সামনে ছুটে এলেন। হাত দিয়ে রুখলেন গাড়িটিকে। পুলিশ ভ্যানকে বাধ্য হয়ে থামতে হলো। উপায় ছিল না, এগোতে গেলে মেয়েটিকে চাপা দিয়ে এগোতে হত। ক্যামেরার সামনে ওই কাজ করার রিস্ক পুলিশ নেয়নি। ফলত পুলিশ ভ্যান থেমে যায়। আর সেই সুযোগে গাড়ির দরজার লক খুলে প্রতিবাদীদের মুক্ত করে দেন বাকিরা। এভাবে গাড়ি আটকালেন যে মেয়েটি, সেই জেন জি’কে  মিডিয়ার লোক প্রশ্ন করছিল, তিনি এমনটি করলেন কেন? মেয়েটির নির্বিকার উত্তর – পুলিশ তো নিজের দায়িত্ব পালন করছে না৷ সহনাগরিকদের প্রতি কর্তব্য তাই তিনিই পালন করলেন! কি বলা যায় একে! স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া! 

(সূত্র: সোশ্যাল মিডিয়া)

বিশে জুলাই ছাত্রেরা মার খেয়েছে। গতকাল পুলিশ লাঠি হাতে তেড়ে যেতেই শয়ে শয়ে ছেলেমেয়ে সামনে দাঁড়িয়ে সটান জাতীয় সঙ্গীত গাইতে শুরু করে দিল। পুলিশ বাধ্য হয়ে লাঠি নামিয়ে গলা মেলালো স্টুডেন্টদের সঙ্গে। পাটনাতেও পুলিশ তাদের উদ্দেশে জল কামান দাগে। ছুটে পালানোর বদলে ‘পাটনা কে লাল্লা’ গান বাজিয়ে সে কি নাচ ছেলেপুলেদের। 

বুকে প্লাকার্ড ঝুলিয়ে এক জেনজি দেবদাস দাঁড়িয়ে। তাতে লেখা, ‘আমার প্রাক্তন আর ধর্মেন্দ্র প্রধান একইরকম। দুজনেই Heartless. হৃদয়হীন’। আহা কী নিষ্পাপ লেগ পুল! 

এসব ওরাই পারে। আমরা চেঁচাই। ঝগড়া করি। পুলিশের ভয় দেখাই। ছক কষি। 

জেন জি স্বতন্ত্র। ওরা একদম চেঁচামেচি পছন্দ করে না। ওরা মজা করে। ওরা পরিশ্রম করে। ওরা বুদ্ধি এপ্লাই করে। ওদের সেন্স অফ হিউমার আলাদা স্তরের।

তাই, ওরা হারতে হারতেও হেসে ফেলে। 

আর, হাসতে হাসতে জিতে যায়।

(সূত্র: সোশ্যাল মিডিয়া)

Leave a Reply