এক
২০২৬ সালের জুলাই-আগস্ট। মিডিয়া ব্যস্ত কখনও AI বা গ্রহ-গ্রহান্তরের খবর নিয়ে আর কখনও-বা শিহরিত ইরান- ইজরায়েল বা ইরান- আমেরিকা বা ইউক্রেন- রাশিয়ার ব্যবহৃত ড্রোন-মিসাইলের মারণ-ক্ষমতায়। মানুষ মারা যাচ্ছেন অসময়ে, কোনো জানান না দিয়েই; হারিয়ে যাচ্ছে অগণন শিশু-নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-বৃদ্ধার যাপন-কথা, ভালোবাসার উত্তরণ কাহিনি, শুনেও শুনছি না জ্যান্ত গ্রাম শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার মধ্য দিয়ে বিজেতার উল্লাস আর বিজিতের আর্তনাদ। দখল আর যুদ্ধ। যুদ্ধ আর দখল। উদ্বাস্তু। শরণার্থী। চেনা শব্দ, অচেনা।
চোখ আটকে গেল ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত গাজায় হতাহতের হিসাব দেখে। একটি রিপোর্ট দেখলাম জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCUR) থেকে প্রকাশিত। এছাড়াও রয়েছে, গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (GHM), ইসরাইল প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF), জাতিসংঘ মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (OCHA), সমন্বিত খাদ্য নিরাপত্তা পর্যায় শ্রেণীবিন্যাস (IPC), ফিলিস্তিনি নীতি ও জরিপ গবেষণা কেন্দ্র (PCPSR), দ্য ল্যানসেট প্রদত্ত রিপোর্ট ।
এই ৩১ মাসে, মোট নিহতের সংখ্যা, কমপক্ষে ৭৩,৭০০+ (তিয়াত্তর হাজার সাত’শ+) (Gaza Health Ministry, UN Women, OCHA, The Lancet) । OCHA ১৮ মার্চ, ২০২৬ এই সংখ্যাটা জানিয়েছিল ৭২,২৫৩ জন। স্বাধীন গবেষণা অনুযায়ী সংখ্যা আরও বেশি: ৭৫,২০০ ভায়োলেন্ট ডেথ অক্টোবর ২০২৩ – জানুয়ারি ২০২৫ এর মধ্যে। মে ২০২৫ পর্যন্ত অনুমান ৯৩,০০০।
খোঁজ করছিলাম, যাঁরা নিহত হলেন, তাঁদের সম্পর্কে আর কিছু জানা যায় কিনা? পেলাম। জানা গেল,
বেসামরিক মানুষই বেশি। IDF এর নিজস্ব ডাটাবেস অনুযায়ী নিহতদের ৮৩% বেসামরিক। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও হাজার হাজার মৃতদেহ। অর্থাৎ মৃতের আসল সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা। ১৬,০০০+ পরিবার ভেঙেছে। নারী বিধবা হয়েছেন। ৭-এর মধ্যে ১টা পরিবার এখন নারী কর্তৃত্বাধীন।
UN Women – এপ্রিল ২০২৬-এ জানাচ্ছে, নিহত হয়েছেন, ৩৮,০০০+নারী (২২,০০০+ মেয়ে শিশু: ১৬,০০০+)। গড়ে প্রতিদিন ৪৭ জন নারী ও মেয়ে নিহত। আহত নারী ও মেয়ে: প্রায় ১১,০০০ (news.un.org) OCHA-এর হিসেব, মার্চ ২০২৬ অব্দি চিহ্নিত নিহতদের মধ্যে পুরুষ: ৩৪,০৭৮। শিশু: ২১,২৮৩। নারী: ১০,৯৮৩। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ৫,১০০ জন। আবাসিক ভবনে নিহতদের ৭০% নারী ও শিশু। The Lancet এর ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর স্টাডি — ভায়োলেন্ট ডেথের ৫৬.২% নারী, শিশু ও বয়স্ক (en.wikipedia.org) । এই ৩০ মাসে OCHA-র হিসাব: ১,৭১,৯১২ জন আহত হয়েছেন। UN বলছে গাজায় এখন বিশ্বে মাথাপিছু শিশু অ্যাম্পুটি সবচেয়ে বেশি।
এত মৃত্যু ঘটলো কোথায়! যুদ্ধক্ষেত্র বলে আলাদা কিছু তো আর নেই। ধ্বংস করার জন্যে আছে চলাচলের রাস্তা, আর রাস্তার দুপাশে ঘরবাড়ি, আবাসন, স্কুল কলেজ, হাসপাতাল, শরণার্থী শিবির। সব রাস্তাই বিধ্বস্ত, তারই মধ্যে বিশেষভাবে গাজার ৪টি রাস্তা —
আল-রাশিদ স্ট্রিট Al-Rashid Street গাজার উপকূল ঘেঁষে যাওয়া প্রধান রাস্তা। উত্তর গাজা থেকে দক্ষিণে যাওয়ার ‘সেফ করিডোর’ ছিল। দুই পাশের বহুতল বাড়ি, দোকান ধ্বংস।
সালাহ আল-দিন স্ট্রিট Salah al-Din Street গাজার মূল হাইওয়ে। খান ইউনিস থেকে গাজা সিটি জোড়া রাস্তা। রাস্তার ধারের আবাসিক বিল্ডিং, স্কুল অনেক ক্ষতিগ্রস্ত।
আল-ওয়াহদা স্ট্রিট Al-Wehda Street গাজা সিটির সবচেয়ে ব্যস্ত বাণিজ্যিক রাস্তা। ২০২১ ও ২০২৩-২৪ এখানে বহু আবাসিক টাওয়ার ভেঙে পড়েছে।
আল-শুজাইয়া এলাকার আল-নাজ্জার স্ট্রিট Al-Najjar Street, Shujaiya শুজাইয়া পাড়া পুরোটাই প্রায় ধ্বংস। এই রাস্তার দুই পাশের বাড়িগুলোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি।
আকাশ থেকে যখন বোমা বর্ষণ হয়, মানুষজন তখন পালাবেন কোথায়? যাবে কোথায়? ওইটুকু তো জায়গা! মোট ক্ষেত্রফল ৩৬৫ বর্গকিমি। মানে কে এম সি এলাকার দেড় গুণের একটু বেশি (১.৭৮ গুণ) ।
১৫ নভেম্বর ১৯৮৮: প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন PLO “State of Palestine” স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এখনকার স্ট্যাটাস—UN Observer State— ২৯ নভেম্বর ২০১২ থেকে জাতিসংঘে ‘Non-member Observer State’। ভোট দিতে পারে না, কিন্তু পতাকা ওঠে। 157টি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে। সরকার পরিচালনা করে Palestinian Authority (PA) ও Hamas। রাজধানী দাবি: Jerusalem। প্রশাসনিক কেন্দ্র: Ramallah। মোট ক্ষেত্রফল ৬০২০ বর্গকিমি — West Bank ৫,৬৫৫ + Gaza 365 জনসংখ্যা: ∼৫,৪৮ মিলিয়ন (2023)। কিন্তু বাস্তবে, পুরো এলাকা ইজরায়েলের দখলে। West Bank ও Gaza-তে PA আংশিক শাসন করে, কিন্তু সীমান্ত, নিরাপত্তা, চলাচল ইজরায়েল নিয়ন্ত্রণ করে।
গোটা গাজা শহর ঘিরে অসংখ্য ‘গেট’। ‘গেট’ এর ৩টা বাস্তব অর্থ—
চেকপয়েন্ট গেট / সামরিক গেট —West Bank-এ শহর-গ্রাম আলাদা করার জন্য ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর বানানো কংক্রিটের গেট, বেড়া, দেয়াল। মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে ID দেখিয়ে, ব্যাগ চেক করিয়ে যেতে হয়। স্কুল, হাসপাতাল, জমিতে যেতেও এই গেট পেরোতে হয়।
বাড়ির গেট / গ্রামের গেট—১৯৪৮-এ Nakba-র সময় মানুষ নিজের বাড়ির গেট, গ্রামের গেট ছেড়ে পালিয়েছিল। সেই গেট আর খোলা হয়নি। চাবিটা এখনও অনেক পরিবারের কাছে আছে।
কারাগারের গেট / সীমান্তের গেট—Gaza-র Erez Gate, Rafah Gate। এগুলো দিয়ে ঢোকা-বেরোনো নিয়ন্ত্রণ হয়।
মাহমুদ দারবিশ, ফাদওয়া তুকানদের কবিতায় বারবার আসে ‘গেট’
‘আমার শহরের গেটে সৈন্য দাঁড়িয়ে’
‘আমি আমার গেটের চাবি নিয়ে ঘুমাই’
‘গেট বন্ধ, আর রুটি ফুরিয়ে গেছে’
এখানে গেট শুধু লোহার না। গেট = দখল, গেট = বিচ্ছেদ, গেট = অপমান।
Mosab Abu Toha
The Gate
(মোসাব আবু তোহা। গাজার কবি ও লেখক। এখন নির্বাসনে আছেন।)
তারা আমার ঠাকুরদাদার নাম জিজ্ঞেস করে।
আমি ঠাকুরদাদার নাম বলি।
তারা বলে: তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই।
তারা আমার বাবার নাম জিজ্ঞেস করে।
আমি বাবার নাম বলি।
তারা বলে: তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই।
তারা আমার নাম জিজ্ঞেস করে।
আমি আমার নাম বলি।
তারা বলে: তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই।
হিবা আবু নাদা। ২০২৩-এর ২০ অক্টোবর গাজায় ইজরায়েলি বোমায় শহীদ হন।
আমি সংখ্যা হতে চাই না।
আমি সেই গল্প হতে চাই, যা মানুষ বলে।
আমি সেই নাম হতে চাই, যা মনে রাখা হয়।
যখন তারা মৃতের হিসাব করে,
আমার নামটা যেন শুধু একটা পরিসংখ্যান না হয়।
আমাকে সেই মেয়েটা হতে দাও যে সমুদ্র ভালোবাসত,
যে খাতার মার্জিনে কবিতা লিখত,
যে ভয় ছাড়া ঘুম থেকে ওঠার স্বপ্ন দেখত।
(গাজায় সবচেয়ে কমন নাম এই ধরনের—
ছেলেদের নাম—মুহাম্মদ Muhammad – নিক: হামুদা Hammouda, মিডো Mido; আহমেদ Ahmed – নিক: আবু হামিদ Abu Hameed; ইউসুফ Yousef – নিক: ইউসি Yousi; মাহমুদ Mahmoud – নিক: হুদা Houda
মেয়েদের নাম—আয়েশা Aisha – নিক: আয়ুশ Ayoosh; ফাতেমা Fatima – নিক: ফাতো Fato; মারিয়াম Mariam – নিক: মিমো Mimo; হিবা Hiba – নিক: হিবু Hiboo
শিশুদের নাম:ছেলে: ওমর Omar – নিক: বুদো Budo; ছেলে: আদম Adam – নিক: দুদু Dudu
মেয়ে: রিম Reem – নিক: রিরি Riri;মেয়ে: লিনা Lina – নিক: লুলু Lulu)
ডায়েরির পাতা:
তারিখ: নেই
কারেন্ট: ০ ঘন্টা
পানি: আধা বোতল
আজ সকালে হামুদা আর বুদো
আল-রাশিদ রোড দিয়ে চাল আনতে গেল।
ফিরে এসে দেখে আমাদের বিল্ডিংটা নেই।
শুধু মিমোর স্কুলের খাতার একটা কোণা
ধ্বংসস্তূপে পড়ে ছিল।
আয়ুশ কাঁদছিল।
ও বলল ‘আমার পুতুলটা রুমে ছিল’।
আমি বললাম চুপ কর রিরি।
ড্রোনের শব্দ হচ্ছে।
অংক কষি এই পাতায়:
৪ জন ছিলাম → ৩ জন আছি
আব্বু… আল-শুজাইয়ার আল-নাজ্জার স্ট্রিটে
কাজে গিয়েছিল।
দুই
ভাবছিলাম এমন এক বীভৎস নিধনযজ্ঞে আমি, আমার দেশের কি কোনো দায় নেই? হাতে এল, Amnesty International-এর দুটি রিপোর্ট। একটি রিপোর্ট আসে লন্ডন থেকে। আরেকটি নিউইয়র্কের Security Council-এর হলঘর থেকে। একটি বলে, কারা অস্ত্র পাঠাচ্ছে। আরেকটি বলে, সেই অস্ত্রের ছায়ায় কী ঘটছে।
৩০ জুলাই ২০২৬, Amnesty International তাদের ৪২ পাতার রিপোর্টের নাম দিয়েছে ‘Made in India: The Supply of Weapons and Ammunition to Israel’। রিপোর্টের কেন্দ্রীয় অভিযোগ স্পষ্ট: ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর, যখন গাজায় যুদ্ধ শুরু হলো এবং ICJ ‘গণহত্যার সম্ভাব্য ঝুঁকি’ নিয়ে সতর্ক করল, তখনও ভারত থেকে ইজরায়েলে অস্ত্র যাওয়া থামেনি। বরং বেড়েছে।
সংখ্যা কী বলছে:
Amnesty shipment-level trade data বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে — ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর থেকে অন্তত ২,৫৯৬টি চালান ভারত থেকে ইজরায়েলে গেছে। এর মধ্যে ছিল ৩,৯০,৫১৬টি ছোট অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ৫,৬৪,৯৭০টি বিস্ফোরক দ্রব্যের কম্পোনেন্ট এবং ২৯৮টি সামরিক গাড়ির যন্ত্রাংশ।
কারা জড়িত:
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারত সরকারের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত প্রধান প্রধান কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এই অস্ত্র ইসরায়েলে যাচ্ছে। নাম করা হয়েছে Munitions India Limited, Advanced Weapons and Equipment India Limited, India Optel Limited-এর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে। এছাড়া বেসরকারি কোম্পানিগুলোও Rafael, IMI Systems, Elbit Systems-এর মতো ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা কোম্পানিকে যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে, যারা সরাসরি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে অস্ত্র দেয়।
Amnesty-র ভাষ্য:
সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেল Agnès Callamard বলেন, ‘আমাদের গবেষণা দেখায়, গাজায় প্রায় প্রতিদিন সম্প্রচারিত গণহত্যা সত্ত্বেও ইজরায়েলি সামরিক খাতে ভারতের সমর্থন অব্যাহত আছে’। তিনি আরও বলেন, ভারত শুধু বেসরকারি কোম্পানির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে বাধ সাদেনি বরং ‘ইসরায়েলের সঙ্গে তার প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব আরও গভীর করেছে’। আন্তর্জাতিক আইনের যুক্তি হলো — জেনে বুঝে এমন অস্ত্র পাঠানো, যা আন্তর্জাতিক অপরাধে ব্যবহৃত হতে পারে, তা ‘সহযোগিতার ঝুঁকি’ তৈরি করে।
West Bank-এর মাটিতে
২৯ জুলাই ২০২৬, জাতিসংঘ, নিউইয়র্কে Security Council-এর বৈঠকে UN-এর উপ-সমন্বয়ক Ramiz Alakbarov দাঁড়িয়ে বলেন, West Bank-এ প্রাণহানি ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’। UN-এর মানবাধিকার দপ্তর OHCHR একই সপ্তাহে সতর্ক করে: বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ‘সর্বকালের সর্বোচ্চ’-তে পৌঁছেছে।
ছবিটা কেমন? ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর West Bank-এ ১,১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত। ২০২৬ সালে ৮৭ জন নিহত, ৮৫০ জন আহত — বেশিরভাগই বসতি স্থাপনকারীদের (সেটলার) হামলায়। ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী Bezalel Smotrich নতুন বসতি অনুমোদনের ঘোষণা দিয়েছেন, যা UN ‘আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ’। OHCHR মুখপাত্র Ravina Shamdasani উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, ইসরায়েলি নেতাদের ‘প্রতিশোধ ও সম্মিলিত শাস্তির’ খোলা আহ্বান, ‘West Bank-কে আরেক গাজা বানানো’র হুমকি স্বরূপ। Alakbarov, Security Council-কে বলেন, ‘এই সংঘাতের কোনো সামরিক বা সহিংস সমাধান নেই’। তিনি ‘বিপজ্জনক গতিপথ’ বদলাতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে ICJ এক উপদেষ্টা মতামতে বলেছিলেন — ১৯৬৭ সাল থেকে গাজা, পূর্ব জেরুজালেম ও West Bank-এর দখল অবৈধ। প্রায় 720,000+ ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারী West Bank, East Jerusalem ও Golan Heights-এ বাস করে।
কারা? কারা এই সেটলার! কার জমি, কত জমি দখল করে রেখেছে এই সেটলারেরা?
এই দখলদারির শুরু হয়:
১. ১৯৬৭ – Six-Day War। ১৯৬৭ সালের Six-Day War-এ ইজরায়েল East Jerusalem, West Bank এবং Gaza দখল করে। এরপরই প্রথম সেটলমেন্ট বানানো শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের জমির উপর।
২. ১৯৮০-এর দশক: সরকারি উৎসাহ
১৯৮০-এর দশকে ইজরায়েলি নীতিতে West Bank ও Gaza-তে আরও সেটলমেন্ট বানাতে উৎসাহ দেওয়া হয়।
৩. ১৯৯৩ Oslo Accords
Oslo চুক্তিতে সেটলমেন্ট নির্মাণ বন্ধের কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে নির্মাণ থামেনি, বরং চলতেই থাকে।
৪. ২০০৫: Gaza থেকে প্রত্যাহার
২০০৫-এ Gaza থেকে সব ইজরায়েলি সৈন্য ও সেটলার সরানো হয়। কিন্তু West Bank-এ নির্মাণ আরও বেড়েছে।
৫. ২০১৬: UN Security Council Resolution 2334
UN বলেছে সেটলমেন্ট আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তবু নির্মাণ বন্ধ হয়নি।
(ওপরের সব তথ্যই aljazeera.com থেকে নেওয়া)
৬. ২০২৩-২০২৬: গতি বেড়েছে অক্টোবর ২০২৩-এর পর। ১৬৫টির বেশি নতুন আউটপোস্ট। ২০২৫-এই এক বছরে ৫৯টি নতুন আউটপোস্ট। ইজরায়েলি NGO-গুলো বলছে সরকার ‘de facto annexation’ করছে অভূতপূর্ব গতিতে।
দখলের পদ্ধতি
‘ফার্ম’ আউটপোস্ট বানিয়ে পাহাড় দখল, তারপর ৫০০ হেক্টর করে এলাকা বন্ধ করে দেওয়া। ২০২৫-এ ৩০,০০০ হেক্টর জমি এভাবে নেওয়া হয়েছে । প্রথমে,
১. জমিকে “state land” ঘোষণা করা
২. সামরিক এলাকা বলে বন্ধ করা
৩. বেদুইন ও কৃষি কমিউনিটির উপর সহিংসতা + ডিমোলিশন অর্ডার
৪. ২০২৩-২০২৬-এর মধ্যে ১০০টির বেশি ফিলিস্তিনি কমিউনিটি পুরোপুরি বা আংশিক খালি হয়ে গেছে
সবচেয়ে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্যালেস্তাইনের West Bank-এর : ৪২% জমি এখন সেটলমেন্ট সংক্রান্ত পদক্ষেপের কারণে প্রভাবিত। Palestinian Colonization and Wall Resistance Commission-এর মার্চ ২০২৬-এর রিপোর্টে এটা বলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ‘ফার্ম’ আউটপোস্টগুলোই ১৮% জমি নিয়ন্ত্রণ করছে — যা গাজার যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল প্রায় ৭%। ২০২৩-২০২৫-এর মধ্যে ১৮৫টি নতুন আউটপোস্ট হয়েছে, যেগুলো মোট ১৮% West Bank জুড়ে। ৭,৮০,০০০-এর বেশি ইজরায়েলি সেটলার বাস করছে ৫৪২টি অবৈধ সেটলমেন্ট ও আউটপোস্টে। এর মধ্যে ১৯২টি সেটলমেন্ট + ৩৫০টি আউটপোস্ট।
West Bank আইনত ৩ ভাগে বিভক্ত:
Area A: ১৮% – ফিলিস্তিনি সিভিল + সিকিউরিটি কন্ট্রোল
Area B: ২২% – যৌথ কন্ট্রোল
Area C: ৬০% – পুরোপুরি ইজরায়েলি সিভিল + সিকিউরিটি কন্ট্রোল। বেশিরভাগ সেটলমেন্ট Area C-তে।
উল্লেখ্য এই যে সেটলমেন্টগুলো আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ। International Court of Justice
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত, হেগ, নেদারল্যান্ডস (ICJ) ২০২৪-এও একই কথা বলেছে।
পুরনো দুই শব্দ আমাকে তাড়া করে ফেরে — ‘অস্ত্র’ আর ‘দখল’। মাঝখানে গাজা। মাঝখানে West Bank।
তিন
এলোমেলো স্মারক কিছু।
ক) একটা পোড়া চাবি – আব্বুর
একটা ছেঁড়া খাতা – মিমোর
একটা নাম: ‘…বা’
পুরো নামটা ছিল হিবা
খ) ঘর নেই। রাস্তা ভাঙা।
কিন্তু নামগুলো আছে।
হিবু চলে গেল।
ও বলেছিল গল্প হতে।
ঠিক আছে হিবু।
আমরা গল্পটা বলব।
আল-ওয়াহদা থেকে আল-রাশিদ পর্যন্ত।
(নিচে ছোট হাতের ছাপ – রিরি )
গ) ছেঁড়া ডায়েরির পাতা
গাজা, জুলাই ২০২৬
তারিখ নেই।
কালি শেষ।
পেন্সিলের দাগে লিখছি।
আজ আবার কারেন্ট আসেনি।
মা চাল গুনছিল। ৩ কাপ।
বাবা বলল, ‘কালকের জন্য রেখে দাও।’
জানালার কাচ নেই।
তাই আকাশটাই জানালা।
ড্রোনের শব্দ হলে আমি গুনি।
এক… দুই… তিন…
তারপর চুপ।
দিদি আজ জিজ্ঞেস করল,
‘আমরা কবে বড় হব?’
আমি বললাম, ‘যেদিন বোমার শব্দ থামবে।’
পাতার কোণাটা ছিঁড়ে গেছে।
ওখানে আমার নাম লেখা ছিল।
এখন শুধু ‘…বা’ পড়া যায়।
যদি কেউ এই পাতা পায়,
বলো আমি সংখ্যা ছিলাম না।
ঘ) আমি গল্প ছিলাম।
অসম্পূর্ণ একটা গল্প।
এটা কোনো খবর না।
এটা একটা নামের তালিকা।
আমরা নাম গুনতে গুনতে ক্লান্ত।
কিন্তু নাম না নিলে তারা হারিয়ে যাবে।
তাই এই পাতায় শুধু ৩টা নাম:
হিবা।
রিম।
ইউসুফ।
তারা কবিতা লিখত, আঁকত, ফুটবল খেলত।
ওরা সংখ্যা ছিল না।
ঙ) স্মারক বাক্য – দেওয়ালের লেখা
গাজার একটা ভাঙা দেওয়ালে স্প্রে দিয়ে লেখা ছিল:
“আমরা এখানে ছিলাম।
আমরা রুটি ভাগ করে খেতাম।
আমরা সমুদ্র দেখতাম।
মুছে দিও না।
হয়ত অনাবশ্যক তবুও একটি সংযোজন
১) এটা আর জমির লড়াই না, অস্তিত্বের লড়াই। আমরা হিসাব করি হেক্টরে। কিন্তু Hiba Abu Nada বলেছিলেন: ‘I don’t want to be a number. I want to be a story that is told.’ ‘আমি সংখ্যা হতে চাই না। আমি সেই গল্প হতে চাই, যা মা রাতে তার ছেলেকে শোনায়।’ আর Mosab Abu Toha লিখেছিলেন: ‘they ask for my grandfather’s name. I give it. They say: You do not exist.’ ‘দাদার নাম দিই। তারা বলে: তোমার অস্তিত্ব নেই।’ ৪২% মানে শুধু মাটি না। ৪২% নাম মুছে দেওয়ার চেষ্টা। ১৯৬৭-তে শুরু। ২০২৬-এ এসে গতি আরও। প্রশ্ন একটাই — এই গল্পটা আমরা কতদিন সংখ্যা দিয়ে ঢেকে রাখব?
২) ১৯৪৭: জাতিসংঘের ১৮১ নম্বর প্রস্তাবে প্যালেস্টাইনকে ইহুদি ও আরব রাষ্ট্রে ভাগের প্রস্তাব।
১৪ মে ১৯৪৮: ইজরায়েল রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
১৫ নভেম্বর ১৯৮৮: প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র স্বাধীনতা ঘোষণা করে
২৯ নভেম্বর ২০১২: জাতিসংঘে প্যালেস্টাইন “UN observer state” মর্যাদা পায়। ১৫৭টি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে।
ইজরায়েল যে যে অঞ্চল দখল করেছে –
১৯৬৭-এর Six-Day War-এর পর: West Bank – জর্ডান থেকে
East Jerusalem – জর্ডান থেকে
Gaza Strip – মিশর থেকে।
২০০৫-এ ইজরায়েল একতরফাভাবে সেনা প্রত্যাহার করলেও অবরোধের কারণে জাতিসংঘ এখনও ‘দখলকৃত’ হিসেবে ধরে
Golan Heights – সিরিয়া থেকে।
১৯৮১-তে ইজরায়েল ‘Golan Heights Law’ দিয়ে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করে
Sinai Peninsula – মিশর থেকে। ১৯৮২-এ মিশর-ইজরায়েল শান্তি চুক্তিতে ফেরত দেয়।
দখলকৃত অঞ্চলে ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা: West Bank: ৫,২৯,০০০ জন, East Jerusalem বাদে
East Jerusalem: ২,৪৬,০০০ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী
মোট West Bank + East Jerusalem: ২০২২ সালে ৭,০০,০০০-এর বেশি। ২৭৯টি বসতিতে থাকে
Golan Heights: ২০,০০০-এর বেশি ইজরায়েলি নাগরিক
মোট: প্রায় ৭,২০,০০০+ ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারী West Bank, East Jerusalem ও Golan Heights-এ বাস করে।
৩) ১৯১৬-১৮ তুর্কি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ। লড়লেন মূলত আরব মুসলমান ও খ্রিস্টান। ইহুদিরা আলাদা আন্দোলনে ছিল।
আরব ভেঙে আলাদা আলাদা রাষ্ট্র হলো মূলত ১৯১৮ থেকে ১৯৪৮ এর মধ্যে। এককালে পুরোটা ‘অটোমান আরব প্রদেশ’ ছিল। তারপর ভেঙে ২২টা দেশ হলো। ৩টি ধাপে—
ধাপ ১. ১৯১৮ – ১৯২২ | ১ম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্য হেরে গেল। তুর্কিদের পতন + ব্রিটেন-ফ্রান্সের ভাগ।
ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে ‘সাইকস-পিকো চুক্তি ১৯১৬’ করে আরব জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল।
জাতিসংঘ ‘ম্যান্ডেট’ দিল:ব্রিটেনের ম্যান্ডেট: প্যালেস্টাইন, ইরাক, ট্রান্সজর্ডান এবং ফ্রান্সের ম্যান্ডেট: সিরিয়া, লেবানন
ধাপ ২: ১৯২০ – ১৯৪৬ | একে একে স্বাধীনতা। ম্যান্ডেট শেষ করে দেশগুলো স্বাধীন হলো। ১৯২২: মিশর ১৯৩২: সৌদি আরব ১৯৪১: ইরাক ১৯৪৩: লেবানন, সিরিয়া ১৯৪৬: জর্ডান ১৯৪৮: ইজরায়েল হলো + প্যালেস্টাইন ভাগ হলো
ধাপ ৩: ১৯৬০ – ১৯৭১ | তেল + উপনিবেশ শেষ। উপসাগরের দেশগুলো তেল পাওয়ার পর স্বাধীন হলো:১৯৬১: কুয়েত ১৯৭১: UAE, বাহরাইন, কাতার ১৯৬৭: দক্ষিণ ইয়েমেন
৪) ব্রিটেন-ফ্রান্সের উপনিবেশ নীতি ‘Divide and Rule’ —বড় আরব রাষ্ট্র হলে তাদের কন্ট্রোল করা কঠিন। তাই উপজাতি, ধর্ম, এলাকা দেখে ছোট ছোট রাষ্ট্র বানালো। রাজা বসালো। তেল আর ভূগোল। যেখানে তেল পাওয়া গেল সেখানে আলাদা শেখতন্ত্র হলো – সৌদি, কুয়েত, UAE। মরুভূমি আর পাহাড়ের জন্য যোগাযোগ কঠিন ছিল, তাই এক থাকা মুশকিল। আরব জাতীয়তাবাদ vs স্থানীয় পরিচয়। সবাই ‘আরব’ হলেও মিশরীয়, সিরিয়ান, ইরাকি পরিচয় বেশি শক্তিশালী ছিল। নেতারাও নিজের রাজ্য চাইল। মোট ২২টা আরব লীগের দেশ। আরবরা এখনও একটা ‘জাতি’ হিসেবে নিজেদের দেখে। ভাষা, সংস্কৃতি এক। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ২২টা আলাদা দেশ। অনেকেই বলে ‘আমরা এক জাতি, ২২টা রাষ্ট্র’। ২০০১-এর পর: মধ্যপ্রাচ্যে USA-র যুদ্ধ, ঘাঁটি।
তথ্যসুত্র: জুলাই-আগস্ট ২০২৬-এর Amnesty ও জাতিসংঘের রিপোর্ট
ঋণস্বীকার: চলমান সন্ত্রাস: প্যালেস্টাইন-ইজরায়েল — শম্পা মিত্র
